চকরিয়ায় তামাকের গ্রাসে কৃষি ও বনভূমি, পুড়ছে ১৫ কোটি টাকার কাঠ


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা একসময় ‘শস্য ভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন সেখানে চলছে তামাক চাষের ভয়াবহ আগ্রাসন। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরের উর্বর পলিমাটি, সরকারি খাসজমি এমনকি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের টিলা ও সমতল ভূমি চলে যাচ্ছে তামাক কোম্পানির দখলে। কৃষি জমি কমে যাওয়ায় একদিকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে তামাক শোধনের জন্য প্রায় আট হাজার চুল্লিতে প্রতিবছর পোড়ানো হচ্ছে আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার কাঠ।

সরেজমিনে উপজেলার তামাকপ্রবণ এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চকরিয়ার অন্তত আটটি ইউনিয়নে ফসলি জমি ও বনভূমি দখল করে তামাক চাষ হচ্ছে। সরকারিভাবে এই চাষ বন্ধে কঠোর কোনো আইন না থাকায় টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন। এতে বোরো ধান, রবিশস্য ও শাকসবজি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

তামাকের বিস্তারে হুমকির মুখে মাতামুহুরী

চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ জানান, তামাক চাষের কারণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে মাতামুহুরী নদী। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে তামাক ক্ষেতের বিষাক্ত সার ও কীটনাশক নদীতে মিশে মাছের প্রজনন ও অভয়াশ্রম ধ্বংস করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল ও বরইতলী ইউনিয়নে তামাকের আবাদ বেড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদ বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর ও কাকারা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মাতামুহুরী নদীর দুই তীর এবং আশপাশের পাহাড়ি টিলার প্রায় ৮০ শতাংশ জমিই এখন তামাকের দখলে। নদীর চরের খাসজমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল কিছুই বাদ যাচ্ছে না এই আগ্রাসন থেকে।

সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার গরমিল

তামাক চাষের জমির পরিমাণ নিয়ে কৃষি বিভাগের তথ্যের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার তথ্যের বিশাল ব্যবধান রয়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৬২০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

তবে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তামাকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত এনজিও ‘উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা’ (উবিনীগ)-এর জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, চকরিয়ার আটটি ইউনিয়নে ব্যক্তিগত জমি, নদীর তীর ও পাহাড়ি ভূমি মিলিয়ে অন্তত ২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

উবিনীগ কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. জয়নাল আবেদীন খাঁন বলেন, “তামাক শোধন করতে গিয়ে প্রতিবছর কক্সবাজার ও বান্দরবানের প্রায় আট হাজার চুল্লিতে অন্তত ১৫ কোটি টাকার কাঠ পোড়ানো হয়। এতে জমির উর্বরা শক্তি কমার পাশাপাশি চাষি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।”

প্রলোভনে আটকা কৃষক, নিরুপায় জনপ্রতিনিধিরা

অভিযোগ রয়েছে, টোব্যাকো কোম্পানিগুলো মাঠপর্যায়ে কর্মীদের মাধ্যমে কৃষকদের ঋণ, সার ও অগ্রিম দাদনের প্রলোভন দেখিয়ে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি বনবিভাগের কার্যালয়ের পাশে সংরক্ষিত বনের ভেতরে তামাক চাষ হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, “দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে এখানে তামাকের আগ্রাসন চলছে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ অনেক সচেতনতামূলক সভা করলেও কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে প্রান্তিক চাষিরা তামাক চাষ ছাড়তে পারছেন না।”

একই ধরনের অসহায়ত্বের কথা জানান বমুবিলছড়ি ও কাকারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা। তারা বলছেন, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ না করা হলে অধিক লাভের আশায় কৃষকরা এই বিধ্বংসী চাষ চালিয়েই যাবেন।

চুল্লিতে পুড়ছে বন, নষ্ট হচ্ছে মাটি

তামাক চাষিরা জানান, ভালো মানের তামাক বা ‘গ্রেড’ নিশ্চিত করতে চুল্লিতে কাঠ পোড়ানো ছাড়া উপায় নেই। প্রতি মৌসুমে একটি চুল্লিতে ৪০ হাজার কেজি তামাক শোধন করতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি কাঠ পোড়াতে হয়। এই জ্বালানির ৮০ শতাংশই সংগ্রহ করা হয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে। এছাড়া চুল্লি তৈরির খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেগুন ও গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

একই জমিতে বারবার তামাক চাষ ও অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা শক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, “তামাক চাষ বন্ধে সরকারিভাবে কোনো আইনি বিধি-নিষেধ নেই। তবে আমরা কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করছি এবং বিকল্প হিসেবে তরমুজসহ অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছি। কাকারা ইউনিয়নে ইতোমধ্যে তরমুজ চাষ শুরু হয়েছে।”