
চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯টি সহকারী শিক্ষকের পদ থাকলেও বর্তমানে সেখানে কর্মরত রয়েছেন ২৫ জন। সাবেক সংসদ সদস্যের ‘রোষানল’, শিক্ষা অফিসের গাফিলতি এবং উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়নের ফলে এই অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ পাশেই আরও ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম শিক্ষক সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পটিয়া সংসদীয় আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর রোষানলের শিকার হয়ে ওই বিদ্যালয়ের ১৭ জন শিক্ষককে একযোগে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১০ জন শিক্ষক ভয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিলেও ৭ জন উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত তাদের বদলি স্থগিত করলেও শিক্ষা অফিস গোপনে ওই পদে অন্য শিক্ষকদের পদায়ন করে, যার ফলে এখন পদের চেয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা উম্মে হাবিবা চৌধুরী তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। তদন্তে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের একটি দল বিদ্যালয়ে গেলে সহকারী শিক্ষকরা সাক্ষ্য দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিমল কান্তি মিত্রের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান শিক্ষককে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বিষয়টি তৎকালীন এমপি সামশুল হক চৌধুরী জানার পর তিনি ক্ষুব্ধ হন। প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সাক্ষ্য দেওয়া ১৭ জন সহকারী শিক্ষককেও শাস্তিস্বরূপ একযোগে বদলির সুপারিশ করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০২৩ সালের ১৩ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাসরিন সুলতানার স্বাক্ষরে ওই ১৭ জনের বদলি আদেশ জারি করা হয়।
এই আদেশের বিরুদ্ধে ৭ জন শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন (রিট নং- ৮৪৫৬/২৩) দায়ের করেন। রিটকারী শিক্ষকদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলী ইমাম খালেদ রহিম জানান, উচ্চ আদালত দুই দফা শুনানির পর ওই ৭ শিক্ষকের বদলি আদেশ স্থগিত রাখেন। শিক্ষা অফিস দুবার আপিল করলেও আদালত স্থগিতাদেশ বহাল রাখেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা জানান, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার পরও বিদ্যালয় বন্ধের সুযোগে পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস গোপনে অন্য বিদ্যালয় থেকে ৬ জন শিক্ষককে এনে সেখানে যোগদান করায়। ফলে বর্তমানে ১৯ পদের বিপরীতে ২৫ জন শিক্ষক রয়েছেন।
এ বিষয়ে শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদারককারী পটিয়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জুবরত খান বলেন, তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন, তবে বিষয়টি অবগত আছেন। উচ্চ আদালত থেকে ৭ শিক্ষকের বদলি স্থগিত থাকার পরও অন্য বিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষকদের কারণে অতিরিক্ত শিক্ষক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনিও স্বীকার করেন, অন্য বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহিমের দাবি, উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করা হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৭ শিক্ষকের বদলি আদেশ স্থগিত থাকলেও তাদের স্থলে যারা যোগদান করেছেন, তাদেরও ওই বিদ্যালয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কর্মকারও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, অন্য বিদ্যালয় থেকে আগত শিক্ষকদের যোগদানের বিষয়েও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। তবে এক স্কুলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক এবং পাশের স্কুলগুলোতে শিক্ষক শূন্যতার বিষয়ে সদুত্তর মেলেনি।
