পুলিশের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চট্টগ্রামে


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে অতীতের বিতর্কিত ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে চায় পুলিশ। তবে ভোটের দিন রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা যাবে কি না, তা নিয়ে খোদ বাহিনীর ভেতরেই এক ধরনের ভীতি ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে নির্বাচনের দিন আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা বা ‘সবুজ সংকেত’ চেয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে আইজিপি স্পষ্ট করেছেন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা না পেলে ভোটের দিন চাপমুক্তভাবে কাজ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে না। এতে ভবিষ্যতে পুলিশের অস্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সংকটে পড়তে পারে।

আইজিপি বাহারুল আলম সোমবার বলেন, “সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভয় ও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে চায় পুলিশ। এ জন্য ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটদান নিশ্চিত করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের কাছে সবুজ সংকেত চাওয়া হয়েছে।”

পুলিশ সদর দপ্তরের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল জয়ের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে পারে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হতে পারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে গেলে পুলিশ রাজনৈতিক বা ‘মব’র চাপের মুখে পড়তে পারে—এমন শঙ্কাও কাজ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপার বলেন, “বড় সমস্যা হলো—৫ আগস্টের পর থেকে কিছু মানুষ পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে মানতে চাইছে না। তারা মনে করে, অন্যায় করলেও পুলিশের কিছু বলার অধিকার নেই। নির্বাচনের দিন কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সর্বোচ্চ ক্ষমতা যদি না থাকে, তাহলে পুলিশের মাঠে থাকা না থাকা সমান। আমরা আইনের ভেতরে থেকে কাজ করার নিশ্চয়তা চাই।”

সম্প্রতি হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানকে আটকের পর থানা ঘেরাও করে আদালত বসিয়ে জামিন শুনানির দাবির ঘটনাটি পুলিশের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ১৬ হাজার ৬৭৫টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে চট্টগ্রামে। ঢাকা বিভাগ ও মহানগরেও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে ৩ জন অস্ত্রধারী এবং বাকি ১০ জন (৬ পুরুষ ও ৪ নারী) অস্ত্রবিহীন থাকবেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নজরদারির জন্য জেলা পুলিশের নিজস্ব অর্থায়নে বডি ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলিতে চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। প্রার্থীদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানীর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিহিত একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পুলিশের ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, “ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন—এটিই পুলিশের দায়িত্ব। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, সে যে দলেরই হোক না কেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নির্বাচনে পুলিশকে মাঠে নামিয়ে কাজের স্বাধীনতা না দিলে কোনো ফল আসবে না। যে-ই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।”