‘আদেশ না মানলে শাস্তি, মানলে আজ ফেরারি’—আত্মগোপনে থাকা পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দি


জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ এখনও প্রশমিত হয়নি। নির্বিচারে গুলি ও হাজারো প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে অসংখ্য পুলিশ সদস্য বর্তমানে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদের এক কর্মকর্তা একুশে পত্রিকার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, কোন মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে তারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে বাধ্য হয়েছিলেন।

সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী অভিযুক্তের বক্তব্য শোনার অবকাশ থেকে ওই কর্মকর্তার চিঠির চুম্বক অংশ এবং এর বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

‘পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে আজ আমি ফেরারি’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর চিঠিতে আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আমি বাংলাদেশ পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। দীর্ঘ দুই দশক সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। কর্মক্ষেত্রে চৌকস নৈপুণ্যের জন্য রাষ্ট্রীয় এবং বিভাগীয় পুরস্কারও অর্জন করেছি। এই দীর্ঘ চাকরিতে আমার বিরুদ্ধে কখনও কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু সেই আমার বিরুদ্ধেই এখন হত্যার অভিযোগ উঠছে, শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠছে, গুলি করার অভিযোগ উঠছে।”

তিনি আরও লেখেন, “আমি অস্বীকার করছি না যে শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগ হয়নি। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেই কঠিন পরিস্থিতিতে আমার সকল পদক্ষেপ ছিল প্রচলিত আইন, সংবিধান এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা। অথচ আজ মামলার ভয়ে, প্রাণের ভয়ে আমি পলাতক।”

সহিংসতা এবং আত্মরক্ষার আইনি যুক্তি

গুলি ছোড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “যখন আক্রমণকারীর হাতে জীবন বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন আত্মরক্ষার জন্য বলপ্রয়োগ আইনত বৈধ। জুলাই মাসে আমাদের ওপর হওয়া হামলাগুলোতে জীবন হারানোর সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ হত্যা এবং এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে মারার ঘটনা আমাদের চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। যখন থানার মতো স্পর্শকাতর স্থানে আক্রমণ করা হয়, তখন আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল— আত্মসমর্পণ অথবা জীবন ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা রক্ষার্থে বলপ্রয়োগ করা। জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী, জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য হলে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যায়। আমাদের কাছে সেটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা।”

বিপরীত চিত্র: আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও ভিডিও প্রমাণ

তবে পুলিশ কর্মকর্তার এই ‘আত্মরক্ষা’র যুক্তির বিপরীতে মাঠপর্যায়ের চিত্র ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে ‘অপ্রয়োজনীয় এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নিরস্ত্র, দূরবর্তী বা হুমকি নয়—এমন আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করেও সরাসরি বুকে বা মাথায় গুলি চালানো হয়েছে। এমনকি আবু সাঈদের মতো নিরস্ত্র শিক্ষার্থীকে খুব কাছ থেকে গুলি করার দৃশ্য পুলিশের ‘শুধুমাত্র আত্মরক্ষা’র দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে নারী, শিশু ও পথচারীও রয়েছেন। ফলে ‘জীবন বাঁচাতে গুলি’—এই তত্ত্বটি বাছবিচারহীন গুলিবর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ধোপে টেকে না বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করার সুযোগ ছিল না’

চেইন অব কমান্ডের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ একটি শৃঙ্খলিত বাহিনী। দণ্ডবিধির ৭৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজেকে আইন দ্বারা বাধ্য বলে বিশ্বাস করে কোনো কাজ করলে তা অপরাধ নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশ পালন করা আমার কর্তব্য ছিল। আদেশ অমান্য করা চাকুরিবিধি পরিপন্থী। আমরা এমন এক দোটানায় ছিলাম যেখানে আদেশ পালন না করলে বিভাগীয় শাস্তি, আর পালন করলে এখন হতে হচ্ছে ফেরারি।”

লক্ষণীয় বিষয় হলো, শেখ হাসিনার পতনের পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে জানিয়েছিল যে, পুলিশ সদস্যদের গুলি চালাতে ‘বাধ্য করা হয়েছিল’ এবং তাদের জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা দাবি করে, রাজনৈতিক আদেশের কারণে তারা এই পরিস্থিতির শিকার এবং তাদেরকে জনগণের সামনে ‘ভিলেন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং এই কর্মকর্তার চিঠির ভাষ্য একই সূত্রে গাঁথা—যা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

বিচারের দাবি

চিঠির শেষ অংশে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, কোনো রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি নই। আজ যদি বিধিগত আদেশ পালন করার অপরাধে আমাদের শাস্তি পেতে হয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো পুলিশ সদস্য নিজের জীবন বিপন্ন করে জনগণের সুরক্ষা দিতে আসবে না। আমাদের বিচার হোক কাজের বৈধতা ও বাধ্যবাধকতার নিরিখে, কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে নয়।”