
চট্টগ্রাম নগরীর বাদুরতলার হোসাইন মঞ্জিল। ২৪টি ফ্ল্যাটের এই ভবনে লাইনের গ্যাস নেই, তাই বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা সিলিন্ডার গ্যাস বা এলপিজি। ভবনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, প্রতিদিন ভবনটির বাসিন্দাদের জন্য তিন থেকে চারটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখন বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, যা তাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু হোসাইন মঞ্জিল নয়, পুরো চট্টগ্রামজুড়েই এখন এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট। নগরীর আগ্রাবাদের বাসিন্দা আরফাতুল ইসলাম জানান, অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে পেরেছেন, তবে সে জন্য তাকে গুনতে হয়েছে ২ হাজার টাকা। যেখানে সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা, সেখানে প্রায় দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকার মেসার্স মোহাম্মদীয়া ট্রেডিংয়ের কর্ণধার মুহাম্মদ আলী আজম জানান, তার দোকানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ ক্রেতা গ্যাসের জন্য আসেন। নগরীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ ভিড় করছেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহে তিনি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মাত্র ১৫টি সিলিন্ডার পেয়েছেন। ফলে অধিকাংশ ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি হারে এলপিজির চাহিদা বাড়লেও আমদানির চিত্র উল্টো। ২০২৩ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার টনে। কিন্তু গত বছরে আমদানি প্রায় দেড় লাখ টন কমে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে নেমে এসেছে। বছরের শেষ তিন মাসে এই কমার হার ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা ছিল, তাও বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে এবং তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
বিইআরসি সূত্র জানায়, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৫২টি কোম্পানির মধ্যে ২৩টির আমদানি সক্ষমতা থাকলেও গত বছর প্রতি মাসে নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শেষদিকে অনেকেই আমদানি বন্ধ রেখেছিল।
সংকটের নেপথ্য কারণ
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ মনে করেন, বর্তমান সংকট মূলত সরবরাহজনিত। তিনি জানান, গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি এলপিজি বহনকারী জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল, যা ডিসেম্বরে বেড়ে আরও ২৯টি জাহাজে গড়িয়েছে। ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ এবং চীন বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ এলপিজি কেনায় বাংলাদেশের জন্য এলপিজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক এই পরিস্থিতির জন্য নীতিগত জটিলতাকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, লোয়াবের পাঁচটি সদস্য কোম্পানি এক বছর আগে আমদানি বাড়ানোর অনুমোদন চাইলেও মন্ত্রণালয় নীতিমালার দোহাই দিয়ে তা নাকচ করে দেয়। নতুন প্ল্যান্টের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি।
সারা দেশে একই চিত্র
সংকটের আঁচ কেবল চট্টগ্রামেই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই লেগেছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আখতার জানান, তিনি কয়েকটি দোকান ঘুরে একটি সিলিন্ডার পেয়েছেন, যার জন্য তাকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান পরিস্থিতির কোনো উন্নতির সুখবর দিতে পারেননি। তিনি জানান, এখনো ৭০ শতাংশ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে, তবে শিগগিরই সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঢাকার বাইরে রাজশাহীতেও হাহাকার চলছে। রাজশাহী শহরের সাধুর মোড় এলাকার গ্যাস বিক্রেতা ইমরান আলী জানান, তিনি ভ্যানে করে খালি সিলিন্ডার নিয়ে পরিবেশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটি সিলিন্ডার পাননি। গ্যাসের অভাবে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। রাজশাহী শহরের রামচন্দ্রপুর এলাকার মোহন আলী গ্যাস না পেয়ে কেরোসিন চুলা কিনেছেন। অন্যদিকে রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া শাহরিন জানান, রান্নার জন্য তিনি বিদ্যুৎচালিত চুলা বা ইন্ডাকশন কুকারের ওপর নির্ভর করছেন।
বরিশাল শহরের চিত্রও ভিন্ন নয়। সেখানে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দিতে হচ্ছে চড়া দাম। শহরের নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আল আমিন জানান, ১ হাজার ৬০০ টাকাতেও সিলিন্ডার মিলছে না। কলেজ অ্যাভিনিউ এলাকার খুচরা বিক্রেতা মনির হোসেন জানান, তাকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
বিইআরসি এবং জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সংকট মোকাবিলায় এলপিজি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং আমদানির অনুমতি বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং আশা করা হচ্ছে আমদানি বাড়লে শিগগিরই সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
