
শীতের সকাল মানেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে খেজুর রসের ঘ্রাণ আর ধোঁয়া ওঠা পিঠার আয়োজন। যান্ত্রিকতার ভিড়ে এই চিরায়ত দৃশ্য যখন অনেকটাই ম্লান হতে বসেছে, ঠিক তখনই এক টুকরো গ্রামীণ বাংলাকে ফিরিয়ে আনল ফটিকছড়ির বাইতুল হিকমা মাদ্রাসা। ইট-পাথরের নগরায়ণ যখন ভুলিয়ে দিতে চাইছে শেকড়ের টান, তখন এই মাদ্রাসার প্রাঙ্গণ হয়ে উঠল আবহমান বাংলার সংস্কৃতির এক জ্যান্ত ক্যানভাস।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) শীতের সকালে মাদ্রাসার আঙিনায় পা রাখতেই ভেসে আসে ভাপা আর চিতই পিঠার মন মাতানো সুবাস। কুয়াশা ভেদ করে তখন উঁকি দিচ্ছিল সোনালি রোদ, আর সেই রোদের মতোই উজ্জ্বল ছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মুখের হাসি। এটি ছিল বাইতুল হিকমা মাদ্রাসার আয়োজনে দ্বিতীয়বারের মতো ‘পিঠা উৎসব’। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়াস পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মাদ্রাসার মাঠে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছিল ৩৩টি স্টল। প্রতিটি স্টলেই ছিল পিঠার পসরা। কী ছিল না সেখানে! ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, দুধচিতই, রস পিঠা থেকে শুরু করে নিপুণ হাতে তৈরি নকশি পিঠা—সব মিলিয়ে যেন পিঠার রাজ্য। শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর স্থানীয় উৎসুক মানুষের ভিড়ে প্রতিটি স্টল ছিল সরগরম। কেবল পিঠা কেনা বা খাওয়াই নয়, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা পরিচিত হচ্ছিল তাদের বাপ-দাদার আমলের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা যখন পরম বিস্ময়ে নকশি পিঠার কারুকাজ দেখছিল, তখন অভিভাবকদের চোখে ছিল হারানো দিনের স্মৃতিকাতরতা।
উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এক আড়ম্বরপূর্ণ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। ফিতা কেটে এই আনন্দযজ্ঞের সূচনা করেন ইসলামী ব্যাংক ফটিকছড়ি শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল মালেক। পুরো আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এম. হাসানুল আমিন, যার তত্ত্বাবধানে এই উৎসব ভিন্নমাত্রা পায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ জোগান মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিম উদ্দিন, সহ-সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, অর্থ সম্পাদক মো. হাসান, প্রচার সম্পাদক মো. আলি এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হাজি আব্দুল মান্নান। অতিথিরা স্টলগুলো ঘুরে দেখেন এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
অতিথিরা তাদের বক্তব্যে তুলে ধরেন যে, নিছক বিনোদন নয়, বরং এই উৎসবের মূল লক্ষ্য হলো শেকড়ের সন্ধান। তারা বলেন, এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে দেশের সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে যেমন নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়, তেমনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকেও করে সুদৃঢ়। মাদ্রাসার আঙিনায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতির এই চর্চা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
আয়োজকরা জানান, গতবারের সফলতার ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তবে এবারের সাড়া জাগানো উপস্থিতি তাদের আরও সাহসী করে তুলেছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে, আরও বর্ণিলভাবে এই পিঠা উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বেলা গড়িয়ে দুপুর নামলেও মাদ্রাসার মাঠে পিঠার স্বাদ আর আড্ডার আমেজ কমেনি এতটুকুও। পিঠার স্বাদে আর আন্তরিকতার উষ্ণতায় ফটিকছড়ির এই প্রাঙ্গণটি যেন হয়ে উঠেছিল এক খণ্ড গ্রামীণ বাংলাদেশ, যেখানে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা মিলেমিশে একাকার।
