মসজিদ নাকি বিএনপির সভার মাইক—ঘোষণার উৎস খুঁজছে তদন্তকারীরা


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব কর্মকর্তা ডিএডি আবদুল মোতালেবকে হত্যার ঘটনাটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই হামলার নেপথ্যে ছিল জঙ্গল সলিমপুরের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তার বাহিনী।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলের এই ঘটনার পর থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। সন্ত্রাসীদের ধরতে রাতভর এবং মঙ্গলবার সকালেও সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

হামলার ঘটনায় র‍্যাবের ডিএডি আবদুল মোতালেব নিহত হন এবং এক সোর্সসহ আরও তিনজন গুরুতর আহত অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন ও সভা চলছিল। বিকেল ৪টার দিকে র‍্যাবের একটি দল সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্মে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে সেখানে প্রবেশ করে।

র‍্যাবের উপস্থিতি টের পাওয়ার পরপরই মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়—‘বাইরে মানুষ ঢুকেছে, সবাই বের হন, বাড়িঘর বাঁচান’। এই ঘোষণার মুহূর্তের মধ্যেই ৪০০ থেকে ৫০০ নারী-পুরুষ লাঠিসৌঁটা ও অস্ত্র নিয়ে র‍্যাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

অভিযোগ উঠেছে, হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারী কালা ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ওমর ফারুক ও কাজী ফারুক। হামলাকারীরা র‍্যাবের মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে এবং ডিএডি মোতালেবসহ সদস্যদের বেধড়ক মারধর করে। একপর্যায়ে র‍্যাবের তিনজন সদস্য ও এক সোর্সকে অপহরণ করে আলীনগরের দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

র‍্যাব-৭ এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ও গণমাধ্যম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, হামলার ধরন দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটি স্বতঃস্ফূর্ত কোনো ঘটনা ছিল না, বরং পুরোপুরি পরিকল্পিত। মাইকে ঘোষণার পর এত অল্প সময়ে ৪০০-৫০০ মানুষ জড়ো হওয়া সাধারণ বিষয় নয়।

তিনি বলেন, র‍্যাব সদস্যরা জানতেন না ভেতরে কোনো নিরীহ পরিবার আছে কি না, তাই তারা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়নি। সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে গিয়েই আমাদের সদস্য নিহত হয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইকে দেওয়া সেই ঘোষণার উৎস। ঘটনাস্থলের আশপাশে তিনটি মসজিদ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মাইকের আওয়াজটি মসজিদের মতো মনে হয়নি, বরং কোনো রাজনৈতিক সভার সাউন্ড সিস্টেম বা শক্তিশালী মোবাইল স্পিকারের মতো মনে হয়েছে।

র‍্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মাইক ব্যবহার করে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না অথবা আগে থেকেই কোনো রিহার্সেল বা মহড়া ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে এলাকার সব সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও ক্লিপ ও মোবাইল ফুটেজ সংগ্রহ করে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন মেম্বার ও সন্ত্রাসী ইয়াছিন বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে।

আলীনগর এলাকার ‘অঘোষিত রাজা’ হিসেবে পরিচিত ইয়াছিন সরকারি পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিবহন সেক্টর থেকে মাসে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে আসছেন। গত বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দুই বাহিনীর সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানিও ঘটেছে।

সোমবারের হামলাটি আধিপত্য বজায় রাখারই একটি বার্তা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল, আলীনগর ও লিংক রোড এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।