‘সবাই ভাগ পায়, বলির পাঁঠা শ্রমিক’


মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকরা এক ভয়াবহ শোষণ ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। দেশটির প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ঋণের জালে আটকা পড়ছেন। অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে বিদেশের মাটিতে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ব্লুমবার্গ’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে আট লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে অন্য দেশের তুলনায় তাদের অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে। এমনকি ভুয়া চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে শফিকুল ইসলাম নামের এক বাংলাদেশি শ্রমিকের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মূলগ্রামে জন্ম নেওয়া শফিকুল ৪ হাজার ৪০০ ডলার (প্রায় ৫ লাখ টাকা) ঋণ করে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কুয়ালালামপুরের উপকণ্ঠে একটি জরাজীর্ণ ভবনে তাকে আটকে রাখা হয়। ১৪৭ দিন অপেক্ষার পরও তার কপালে কাজ জোটেনি। এদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি অবৈধ হয়ে পড়েন এবং ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। তীব্র মানসিক চাপে এক রাতে খিঁচুনি দিয়ে তিনি মারা যান।

তার স্ত্রী হোসনে আরা খাতুন ও ছয় বছরের মেয়ে এখনো ঋণের বোঝা টানছেন। শফিকুলের মতো এমন হাজারো শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

প্রতিবেদনে এই সংকটের মূল হোতা হিসেবে আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিন নামের এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। ১৯৮৮ সালে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়ায় যাওয়া আমিন এখন দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ২০০৮ সালে তিনি ‘বেস্টিনেট’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং মালয়েশিয়া সরকারকে একটি ডিজিটাল নিয়োগ পদ্ধতির প্রস্তাব দেন। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া সরকার তার এই পদ্ধতি গ্রহণ করে।

অভিযোগ রয়েছে, এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমিন এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া কুক্ষিগত করেন। বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১০টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়, যা পরে ১০০টিতে উন্নীত হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মীদের কাছ থেকে ‘সিন্ডিকেট ফি’ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে এই সিন্ডিকেট ফি বাবদ ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যদিও গত জুলাইয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং দুর্নীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আমিনের গভীর সখ্য রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান উপ-প্রধানমন্ত্রী জাহিদ হামিদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা চালু হয়।

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে ক্ষমতায় এলেও তার সরকার বেস্টিনেটের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন (এমএসিসি) তদন্ত শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এমএসিসি প্রধান আজম বাকির সঙ্গে আমিনের গোপন বৈঠকের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ব্লুমবার্গকে বলেন, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক স্তরের মানুষ জড়িত, এমনকি মন্ত্রীরাও এর বাইরে নন। সাবেক এমপি চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকদের প্রয়োজন হলেও আমরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করি। শ্রমিকরা হলো অভিজাত এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিশাল নেটওয়ার্কের শিকার।

বাংলাদেশে ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন এই সিন্ডিকেট ফি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি রিক্রুটমেন্ট এজেন্টদের দাবি, নির্ধারিত ১০টি এজেন্সির বাইরে কেউ কাজ করতে চাইলে তাদের অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য করা হতো। না দিলে বেস্টিনেটের সিস্টেমে তাদের কোনো কাজের আদেশ দেওয়া হতো না। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশ মানি লন্ডারিং ও মানবপাচারের অভিযোগে রুহুল আমিন ও আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মালয়েশিয়াকে অনুরোধ জানালেও আমিন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

শ্রমিক অধিকার কর্মী অ্যান্ডি হল ব্লুমবার্গকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর রুটটি এশিয়ার অন্যতম শোষণমূলক ব্যবস্থা। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো মালয়েশিয়া থেকে পণ্য কিনছে, অথচ তাদের সাপ্লাই চেইনে এই শোষিত শ্রমিকদের ঘাম মিশে আছে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর তার রুমমেটরাও নিখোঁজ হয়ে যান। সম্ভবত তারাও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মালয়েশিয়ার অন্ধকাচ্ছন্ন অবৈধ শ্রমবাজারে হারিয়ে গেছেন। আর শফিকুলের স্ত্রী হোসনে আরা এখন স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা আর পিতৃহারা দুই সন্তানকে নিয়ে গ্রামে অনিশ্চিত দিন কাটাচ্ছেন।