বিদ্যুৎ নেই, তবুও এস আলমের পকেটে মাসে ৩৯৩ কোটি টাকা!


বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের আড়ালে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ ফেঁদেছিল কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগ দেখিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার এক অভিনব ছক কষা হয়েছিল।

এই প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালীকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপ যে আর্থিক অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা জাতীয় কমিটির তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই লুটপাটকে কোম্পানিগুলোর ‘বিশেষ কেরামতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা সম্ভব হয়েছে পতিত সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে।

লুটপাটের এই মহোৎসবের অন্যতম বড় উদাহরণ হলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যেন টাকা তৈরির এক অবারিত মেশিনে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এই কেন্দ্র থেকে কোনো বিদ্যুৎ না নিলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এস আলম গ্রুপকে গুনতে হচ্ছে অস্বাভাবিক অংকের ৩৯৩ কোটি টাকা।

কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগামী ২৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবেই এই প্রকল্প সরকারের কাছ থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এই কেন্দ্রটি নামমাত্র ৪১৪ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিদ্যুৎ বিক্রির আড়ালে তারা হাতিয়ে নিয়েছে ৬৭৪ কোটি টাকা, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়েছে ১৬ দশমিক ২৬ টাকা।

এসএস পাওয়ার প্রকল্পটি ঘিরে জালিয়াতির ঘটনা ছিল শুরু থেকেই পরিকল্পিত। মূলত ২০১২ সালে সরকারি দরপত্রে এস আলম গ্রুপ বরিশালে ২৭৬ মেগাওয়াট এবং অন্য একটি স্থানে ৬১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ পায়। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এবং অলৌকিক ক্ষমতার বলে ২০১৬ সালে দুটি কেন্দ্রকে একত্রিত করে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্থানান্তরের অনুমোদন বাগিয়ে নেয় তারা।

শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের জন্য এস আলম গ্রুপকে ১৫ বছরের আয়কর মওকুফ, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং বিদেশি বিনিয়োগের লাভের ওপর কর মওকুফের মতো বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল দুটি ভিন্ন কেন্দ্রের গড় মূল্যে, যা প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইউনাইটেড গ্রুপের ৫৮৩ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে আসার আগেই টাকা কামানোর ছক চূড়ান্ত করে রেখেছে। ইউনাইটেড আনোয়ারা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখনো চালু হয়নি, কিন্তু বিনিয়োগ উসুল ও ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ের চুক্তি তারা আগেই সেরে ফেলেছে।

জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই প্রকল্পে যৌক্তিক বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল ৮০ কোটি ১৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অথচ ইউনাইটেড গ্রুপ সেখানে বিনিয়োগ দেখিয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৮ লাখ ৫৮ হাজার ডলার। অর্থাৎ, তারা প্রকৃত খরচের চেয়ে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায়ের বন্দোবস্ত করেছে।

সামগ্রিকভাবে মেঘনাঘাটের সামিট, ইউনিক ও জেরা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মতোই চট্টগ্রামের এই প্রকল্পগুলোও একই মডেলে পরিচালিত হচ্ছে। বেশি বিনিয়োগ ও ঋণ দেখিয়ে বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ের এই কৌশলটি ছিল বিদ্যুৎ খাতের আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের একটি সুপরিকল্পিত আয়োজন। চট্টগ্রামের এই প্রকল্পগুলোতে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের যে নকশা করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা থেকে মুক্তির উপায় কি– এ প্রশ্নের জবাবে জাতীয় কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, চুক্তি পর্যালোচনা ছাড়াও পুরোনো ও অদক্ষ কেন্দ্র বাতিল, চুক্তির মেয়াদ নবায়ন না করা, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আর নতুন কেন্দ্রের চুক্তি না করে রিজার্ভ মার্জিন কমিয়ে আনা। এ ছাড়া শিল্পায়নসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হলে বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতার বোঝা ধীরে ধীরে কমে আসবে।