ডিজিটাল প্রচারণায় হুমাম কাদেরের রেকর্ড খরচ, পিছিয়ে নেই অন্যরাও


নির্বাচনী প্রচারের চেনা দৃশ্যপট এবার আমূল বদলে গেছে। অলিগলিতে পোস্টারের জঙ্গল কিংবা দেয়ালজুড়ে চিকা মারার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধে পোস্টার ও দেয়াললিখন বন্ধ থাকায় প্রচারের সেই স্থান দখল করেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। প্রার্থীরা এখন পোস্টার ছাপার খরচ কমিয়ে ঢালছেন ডিজিটাল মাধ্যমে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটার ‘অ্যাড লাইব্রেরি’র তথ্য বলছে, গত ১৭ থেকে ২৩ জানুয়ারি—এই এক সপ্তাহে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রচারের জন্য ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ৯১৫ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি।

ডিজিটাল প্রচারের এই জোয়ারে ব্যয়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী। অন্যদিকে অনুসারীর সংখ্যায় সবার চেয়ে এগিয়ে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা।

মেটার তথ্যানুযায়ী, গত ২৬ অক্টোবর থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে ফেসবুকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৫১ ডলার। এর মধ্যে শেষ এক মাসেই (২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৩ জানুয়ারি) ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১৩৪ ডলার।

গত সাত দিনে ডলার খরচে শীর্ষ ২০টি পেজের মধ্যে ১৫টিই রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল-সম্পর্কিত। এর মধ্যে শীর্ষে থাকা হুমাম কাদের চৌধুরীর পেজ থেকে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১১০ ডলার। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ‘মার্টসেক্টর’ (বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণামূলক চাদরের বিজ্ঞাপনদাতা) ব্যয় করেছে ২ হাজার ৪ ডলার। তৃতীয় স্থানে বাগেরহাট ১, ২ ও ৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম (১,৬২৩ ডলার) এবং চতুর্থ স্থানে ঢাকা-১৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান (১,৩১৬ ডলার)।

খরচের তালিকায় শীর্ষ বিশের মধ্যে ৯টি পেজ বিএনপি-সংশ্লিষ্ট, ৩টি জামায়াতে ইসলামী এবং ১টি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংশ্লিষ্ট।

বিজ্ঞাপন খরচে শীর্ষে না থাকলেও অনুসারীর সংখ্যায় বা ‘ফলোয়ার রিচ’-এ দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের পেছনে ফেলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অনুসারী ৭১ লাখের বেশি।

তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভেরিফায়েড পেজে অনুসারী ৫৭ লাখ, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ২৩ লাখ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ভেরিফায়েড প্রোফাইলে ১৪ লাখ অনুসারী রয়েছে।

তাসনিম জারা নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহেও ডিজিটাল মাধ্যমকে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন। ফেসবুকে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে মাত্র কয়েক দিনে তিনি ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছেন এবং এক দিনের ব্যবধানে ৮ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করেছেন।

নির্বাচন কমিশনের ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, প্রচার শুরুর আগে প্রার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অনেক প্রার্থীই তা মানছেন না।

ডলার খরচে শীর্ষে থাকা হুমাম কাদের চৌধুরীও এখন পর্যন্ত তাঁর ডিজিটাল প্রচারণার তথ্য জমা দেননি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, “শুধু হুমাম কাদের নন, এই আসনের অন্য প্রার্থীরাও এখন পর্যন্ত তথ্য দেননি।”

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীরা বিধি মানছেন কি না, তা দেখা হবে। নির্বাচন শেষে তাদের ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে হবে, যা আমরা যাচাই করব।”

ডিজিটাল প্রচারণার এই বিস্তারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর অপব্যবহার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “ডিজিটাল প্রচারণা এখন বাস্তবতা। তবে এর অপব্যবহার রোধে নির্বাচন কমিশনে একটি বিশেষ মনিটরিং ইউনিট থাকা দরকার।”