অপ্রয়োজনীয় সিজারে বছরে ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা


দেশে গত বছর (২০২৫) প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান সেকশন) মাধ্যমে। আর এসব অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারি নজরদারির ঘাটতি, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এবং আন্তরিকতার অভাবে দেশে সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ‘রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ) এই সভার আয়োজন করে।

গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, বৈশ্বিকভাবে প্রতি ৫টি শিশুর মধ্যে ১টির জন্ম হয় অস্ত্রোপচারে (প্রায় ২১ শতাংশ)। অথচ বাংলাদেশে এই হার দ্বিগুণেরও বেশি। এখানে প্রতি ২টি শিশুর মধ্যে প্রায় ১টি শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারে (৪৫-৫২ শতাংশ)।

তিনি আরও জানান, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে প্রতি ১০টি শিশুর জন্মের মধ্যে ৮ থেকে ৯টিই হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (৮৫-৯০ শতাংশ)। গত বছর দেশে জন্ম নেওয়া ৩৫ লাখ শিশুর মধ্যে ১৬ লাখ ৮০ হাজারই জন্মেছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, “মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক গাফিলতি আছে। বাস্তবতা হলো দেশে এখন আর স্বাভাবিক প্রসব নেই বললেই চলে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে মায়েরা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।”

বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব

অধ্যাপক আনজুমান আরা ২০১৮ সালের একটি গবেষণার সূত্র ধরে জানান, অপ্রয়োজনীয় সিজারের কারণে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই চলছে। প্রয়োজনীয় জনবল বা মানসম্মত প্রসবকক্ষ (লেবার রুম) না থাকায় আর্থিক লাভকে প্রাধান্য দিয়ে অস্ত্রোপচারকে সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৯ সালে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৩০ শতাংশ হতো অস্ত্রোপচারে। ২০০৭ সালে তা বেড়ে ৫১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৯০ শতাংশই হবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

ভয়ভীতি ও সময়ের অভাব

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রী রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, “স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করায় মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হয়। নব্বইয়ের দশকে মায়েরা মারা যেতেন অস্ত্রোপচার না করার কারণে, আর এখন অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারের কারণে তারা মারা যাচ্ছেন।”

হাসপাতালটির শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে সময় লাগে, কিন্তু অধিকাংশ রোগী ও চিকিৎসক সেই ধৈর্য দেখাতে চান না। এছাড়া স্বাভাবিক প্রসবে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে—এমন ভুল ধারণাও প্রচলিত আছে। অথচ নবজাতকের মস্তিষ্কে ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে প্রসবের আগে (প্রসব-পূর্ব সেবা যথাযথ না হলে)।

সমাধানের পথ

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে কাউন্সেলিং ও নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের হার ৬২-৭২ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন আহমেদ। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর।