শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে গণমাধ্যমের পায়ে শিকল পরানো হচ্ছে না তো?

নজরুল কবির দীপু
সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিদিন যে খবরগুলো ভেসে ওঠে, তার পেছনে থাকে অগণিত মানুষের শ্রম, মেধা এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। অতীতে আমি বহু চড়াই-উতরাই দেখেছি, দেখেছি ক্ষমতার পালাবদল এবং নীতিমালার নানা নিরীক্ষা। কিন্তু সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর যে খসড়া প্রস্তুত করেছে এবং তড়িঘড়ি করে মতামত চেয়েছে, তা কেবল আমাকে ভাবিয়েই তোলেনি, বরং গভীরভাবে শঙ্কিত করেছে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সরকার সম্প্রচার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাইছে, যা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। অপতথ্য, গুজব এবং মানহীন কনটেন্টের ভিড়ে একটি শক্ত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা আমরাও অনুভব করি। কিন্তু শৃঙ্খলার নামে যদি এমন কোনো আইনি কাঠামো তৈরি করা হয় যা স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে না। খসড়া আইনটির পরতে পরতে এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যা কার্যকর হলে বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

খসড়া আইনটিতে একটি স্বাধীন ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। শুনতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এর গঠন প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে হতাশা গ্রাস করে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কমিশন গঠনের জন্য যে বাছাই কমিটি করা হবে, তার নেতৃত্বে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কমিটিতে আরও থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং একজন অতিরিক্ত সচিব। অর্থাৎ, যে কমিটি কমিশনের সদস্যদের বাছাই করবে, তার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সরকারের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর হাতে। এখানে সাংবাদিক সমাজ, সম্পাদক পরিষদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখা হয়নি।

সরকার নিজেই যেখানে বিচারক নিয়োগের একমাত্র কর্তা, সেখানে সেই কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো সংবাদের ক্ষেত্রে কতটা নিরপেক্ষ থাকবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি খুব অযৌক্তিক? আমার অভিজ্ঞতা বলে, আমলাতান্ত্রিক বলয়ে গঠিত কোনো কমিশন শেষ পর্যন্ত সরকারের ‘আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই কমিশনটি যদি স্বাধীন সত্তা হিসেবে কাজ করতে না পারে, তবে তা গণমাধ্যমের তদারককারী না হয়ে বরং সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

এই খসড়া অধ্যাদেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং ভীতিকর দিকটি লুকিয়ে আছে ২১ নম্বর ধারায়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রচারকারী যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো ‘গোপনীয় সামরিক ও বেসামরিক তথ্য-উপাত্ত’ প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য কারাদণ্ড ও মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখানেই আমাদের মূল আপত্তির জায়গা।

আমরা জানি, ‘গোপন তথ্য’ এবং ‘জনস্বার্থ’—এই দুটি ধারণা প্রায়ই সাংঘর্ষিক। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, কোনো সরকারি দপ্তরে বড় ধরনের কেনাকাটায় দুর্নীতি হয়েছে বা কোনো আমলা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। দাপ্তরিকভাবে এই দুর্নীতির ফাইলটি ‘গোপন নথি’ হিসেবেই সংরক্ষিত থাকে। এখন কোনো সাহসী সাংবাদিক যদি সেই দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেন, তবে কি তিনি বেসামরিক গোপন তথ্য ফাঁসের দায়ে অভিযুক্ত হবেন? এই আইনে ‘গোপন তথ্য’-এর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। এই অস্পষ্টতা সাংবাদিকদের মাথার ওপর এক স্থায়ী তলোয়ারের মতো ঝুলবে। দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলেই যদি জেল-জরিমানার ভয় থাকে, তবে দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সাংবাদিকরা তখন সেলফ-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

খসড়ায় আরেকটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে বলা হয়েছে সম্প্রচারে ‘ব্যক্তিগত মতামত’ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সাংবাদিকতা বা সংবাদ বিশ্লেষণ কি কেবল যান্ত্রিক তথ্যের সমাহার? সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় কিংবা টক শো-তে বিশ্লেষকরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত তুলে ধরেন, যা জনমত গঠনে সহায়তা করে। ‘ব্যক্তিগত মতামত’ দেওয়া যাবে না—এই শর্তটি কি তবে ভিন্নমত দমনের কৌশল? কোনো সংবাদ বিশ্লেষণ যদি সরকারের মতের বিপক্ষে যায়, তবে কি তাকে ‘ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দেওয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে?

খসড়ায় বস্তুনিষ্ঠতার কথা বলা হয়েছে, যা অবশ্যই কাম্য। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠি কে ঠিক করবে? সরকার নিয়োজিত কমিশন যদি বস্তুনিষ্ঠতার একমাত্র বিচারক হয়, তবে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্থান সংকুচিত হতে বাধ্য। তাছাড়া, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট এবং বাণিজ্যিক পোর্টালকেও লাইসেন্সের আওতায় আনার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ডিজিটাল যুগে মুক্ত চিন্তার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। লাইসেন্স প্রথাকে যদি ভিন্নমতের কণ্ঠরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

প্রস্তাবিত আইনে যে পরিমাণ জরিমানার কথা বলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনো অপরাধের জন্য ১০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূলধারার বড় দু-একটি করপোরেট গণমাধ্যম হয়তো এই ধাক্কা সামলাতে পারবে, কিন্তু মফস্বল পর্যায় থেকে পরিচালিত অনলাইন পোর্টাল, ছোট ও মাঝারি মানের আইপি টিভি বা উদীয়মান ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এই জরিমানা মানেই প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে শুরুতেই এত বড় অংকের আর্থিক দণ্ড গণমাধ্যম শিল্পকে রুগ্ন করে ফেলবে।

তাছাড়া, ৯০ দিনের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তিসংক্রান্ত যে বিধান রাখা হয়েছে, তা শুনতে ভালো শোনালেও এর প্রায়োগিক দিকটি ভয়ের। পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ যখন সাংবাদিকের কাজের তদন্ত করবে, তখন হয়রানির আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। সাংবাদিকতা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয় যে এর জন্য পুলিশের তদন্ত বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

দেশের মঙ্গলের স্বার্থে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমার বিনীত পরামর্শ থাকবে, এই অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করার আগে এর প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করুন। আমরা শৃঙ্খলা চাই, কিন্তু তা যেন শৃঙ্খল না হয়।

প্রথমত, কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে এসে বিচার বিভাগ, প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক পরিষদ এবং মানবাধিকার কর্মীদের সমন্বয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য সার্চ কমিটি গঠন করুন। কমিশন যাতে সরকারের আজ্ঞাবহ না হয়ে সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সালিশি সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, সেই কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ‘গোপন তথ্য’ বা ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’-এর মতো শব্দগুলোর স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আইনের ভেতরেই থাকতে হবে। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর সঙ্গে যাতে এই অধ্যাদেশের কোনো সংঘর্ষ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। জনস্বার্থে দুর্নীতির খবর প্রকাশকে যেন কোনোভাবেই গোপন তথ্য ফাঁস হিসেবে গণ্য না করা হয়, তার স্পষ্ট সুরক্ষা কবচ এই আইনে থাকতে হবে। সামরিক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা যৌক্তিক, কিন্তু ‘বেসামরিক গোপন তথ্য’ শব্দটি ব্যবহার করে দুর্নীতির খবর ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।

তৃতীয়ত, সাংবাদিকতাকে অপরাধের তকমা থেকে মুক্ত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের ভুল-ত্রুটির বিচার হতে পারে প্রেস কাউন্সিল বা দেওয়ানি আইনে, ফৌজদারি আইনে নয়। সাংবাদিকদের জেলে পাঠানো বা কোটি টাকার জরিমানার বিধান সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের কাম্য হতে পারে না। জরিমানার অংক কমিয়ে তা বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চতুর্থত, ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত দেওয়ার সময়সীমা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অপর্যাপ্ত। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন, যা পুরো গণমাধ্যম কাঠামোর ভোল বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। এই সময়সীমা বাড়িয়ে অংশীজনদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংলাপ এবং আলোচনার আয়োজন করুন।

পরিশেষে বলতে চাই, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যমই পারে সরকারকে সঠিক পথে রাখতে এবং রাষ্ট্রের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে কাজ করতে। সরকার যদি আয়নায় কেবল নিজের প্রশংসা দেখতে চায়, তবে তা আত্মঘাতী হবে। সমালোচনার পথ রুদ্ধ না করে, বরং মুক্ত সাংবাদিকতার পথ প্রশস্ত করুন। এতে সরকার এবং রাষ্ট্র—উভয়ই লাভবান হবে। আশা করি, সরকার এই খসড়াটি পর্যালোচনায় উদারতার পরিচয় দেবে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।