
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছিল গত ২২ জানুয়ারি। শুরুর দিকে প্রধান দলগুলোর নেতারা একে অপরকে কথার বাণে বিদ্ধ করতে ব্যস্ত থাকলেও, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই চিত্রে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। ভোটের মাঠে সক্রিয় দুই প্রধান শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন পারস্পরিক দোষারোপ ও কাদা ছোড়াছুড়ির পথ পরিহার করে ভোটারদের মন জয়ে মনোযোগ দিয়েছে। দল দুটির শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও প্রচারণায় প্রতিপক্ষের সমালোচনার চেয়ে দুর্নীতি দমন, চাঁদাবাজি রোধ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতিই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভা দিয়ে বিএনপি এবং উত্তরবঙ্গ সফর দিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রচারণা শুরু করে। শুরুর দিনগুলোতে উভয় দলের নেতারা একে অন্যের অতীত কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় ইস্যু টেনে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপরই দৃশ্যত কৌশলে পরিবর্তন আনে দলগুলো।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গ সফর শেষে এখন বিভিন্ন জনসভায় ‘জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ ও ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে। তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলছেন, দেশের মানুষ চাঁদাবাজি, লুটপাট ও দখলদারির রাজনীতি দেখতে চায় না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করার সুযোগ পাবে না। অপরাধীকে দলীয় পরিচয় নয়, অপরাধ দিয়েই বিচার করা হবে। এর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, তরুণদের প্রশিক্ষণ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ এবং খাল খননের মতো জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বর্তমানে নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ফেনী সফর করছেন। তার বক্তব্যেও এখন পারস্পরিক আক্রমণের বদলে নৈতিকতা ও সুশাসনের কথা উঠে আসছে। তিনি বলছেন, দুর্নীতির মূলে আছে নৈতিক অবক্ষয়। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপস নয়, আমানতদার নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তন আনব। ন্যায়বিচার বা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে চাঁদাবাজির কোনো জায়গা থাকবে না।
প্রচারণার এই কৌশল পরিবর্তন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, আসলে পরস্পর দোষারোপ করে তো কোনো লাভ নেই। নির্বাচন মানেই হলো আমরা দেশের জন্য কী করতে পারি, তা তুলে ধরা। তাই আমরা ইতিবাচক কথাগুলোই বলছি।
একই সুরে কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ। তিনি বলেন, দোষারোপের রাজনীতি দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন ভোটের মাঠে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট মেনেই দলগুলো এই কৌশল নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, নেতাদের সংযত হওয়াটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এটা ধরে রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে যেভাবে সহিংসতায় জড়িয়ে যাচ্ছে, সেটাই এখন বড় সমস্যা। তাদের ওপর কেন্দ্রের কঠোর নির্দেশনা থাকা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতারা সংযত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এখনো ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। বক্তৃতার কথার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার ফারাক দেখা গেলে ভোটারের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
