
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কক্সবাজারের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত জনপদ এখন চকরিয়া ও পেকুয়া। কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনটি দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত হলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শেষ মুহূর্তে এসে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতার দাপট বনাম তারুণ্যের চ্যালেঞ্জের লড়াইয়ে।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হেভিওয়েট প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদের (ধানের শীষ) বিপরীতে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর উদীয়মান নেতা ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক (দাঁড়িপাল্লা)। সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের লড়াইটি কেবল প্রার্থীর সঙ্গে প্রার্থীর নয়, এটি মূলত ‘দলীয় শক্তির’ সঙ্গে ‘আদর্শিক ভোটব্যাংকের’ এক বড় পরীক্ষা।
সালাহউদ্দিনের ‘দুর্গ’ ও আস্থার রাজনীতি
জাতীয় রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমদ কেবল বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাই নন, নিজ নির্বাচনী এলাকায় তিনি ‘উন্নয়নের রূপকার’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) থাকার সময় থেকেই তিনি চকরিয়া-পেকুয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৬ সালে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। ২০০৮ সালে আইনি জটিলতায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ বিপুল ভোটে বিজয়ী হন, যা প্রমাণ করে এই জনপদে সালাহউদ্দিন পরিবারের ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রভাব কতটা গভীর।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদ বিরামহীন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। চকরিয়া পৌরসভা থেকে শুরু করে পেকুয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে তার প্রতিটি পথসভা জনসমুদ্রে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, ১৭ বছরের বঞ্চনা ও মামলার ঘানি টানার পর সালাহউদ্দিনের মাঠে ফেরা নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করেছে। চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ এই এলাকার মানুষের কাছে একজন পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য অভিভাবক। তার হাত ধরেই এ জনপদের উন্নয়ন হয়েছে, তাই মানুষ দলমত নির্বিশেষে তাকেই বেছে নেবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেও তার বক্তব্যে বারবার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলছেন। তিনি বলেন, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও আমি চকরিয়া-পেকুয়াবাসীর খাদেম হিসেবে পাশে থাকব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে থমকে থাকা কাজগুলো শেষ করে একটি সমৃদ্ধ জনপদ উপহার দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
ফারুকের চ্যালেঞ্জ ও নীরব ভোট বিপ্লবের স্বপ্ন
সালাহউদ্দিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক নিয়ে এসেছেন তারুণ্য ও পরিবর্তনের বার্তা। কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্বে থাকা ফারুক প্রকাশ্যে বড় ধরনের শো-ডাউন বা আড়ম্বরপূর্ণ প্রচারণা কম করলেও তার রয়েছে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ‘সাইলেন্ট ভোটব্যাংক’ বা নীরব ভোটাররা এবার বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের একটি বিশাল অংশ এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে ফারুকের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষ এখন গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চায়। চকরিয়া-পেকুয়ায় মানুষের আস্থা এখন জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে। আমরা হইচই কম করলেও জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছি, যার প্রতিফলন ব্যালটে ঘটবে।
মাঠের সমীকরণ ও ভোটের পাল্লা
সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বাচনী মাঠে প্রচারণার দৃশ্যমান চিত্রে বিএনপি যোজন যোজন এগিয়ে। সালাহউদ্দিন আহমদের জনসভাগুলোতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ব্যবসায়ী সমাজ, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটারদের মধ্যে সালাহউদ্দিনের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অন্যদিকে জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের গুছিয়ে রাখা সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ‘ডোর টু ডোর’ ক্যাম্পেইনে বেশি জোর দিচ্ছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দৃশ্যত সালাহউদ্দিন এগিয়ে থাকলেও ফারুকের নীরব ভোটব্যাংক ভোটের দিন বড় অঘটন ঘটাতে পারে। বিশেষ করে জোটের রাজনীতিতে ফাটল না ধরলে এবং জামায়াতের কর্মীরা শেষ পর্যন্ত মাঠ ধরে রাখতে পারলে লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে।
নিরুত্তাপ হাতপাখা ও পরিসংখ্যান
প্রধান দুই দলের এমন তুমুল লড়াইয়ের মাঝে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মাওলানা ছরওয়ার আলম কুতুবী (হাতপাখা) ভোটের মাঠে একেবারেই নিষ্প্রভ। নির্বাচনী এলাকার অলিগলিতে তার কোনো পোস্টার বা ব্যানার চোখে পড়ছে না, প্রচারণাও নেই বললেই চলে। শীতের বৈরী আবহাওয়ার মতোই হাতপাখার ক্যাম্পেইনও জমে।
জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, কক্সবাজার-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৯ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬২০ জন। চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯০ জন এবং পেকুয়া উপজেলার ৭ ইউনিয়নে ভোটার ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৯৯ জন। মোট ১৭৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সালাহউদ্দিন কি তার পুরনো দুর্গ ধরে রাখবেন, নাকি তরুণ ফারুক নতুন ইতিহাস গড়বেন—তার উত্তর মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। তবে এটুকু নিশ্চিত, চকরিয়া-পেকুয়ার মানুষ এবার একটি জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখার অপেক্ষায় আছেন।
