
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে। প্রায় দুই দশকের আলোচনার পর চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিকে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা ‘মাদার অব অল ডিলস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর ফলে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে ভারতের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যের শুল্ক উঠে যাবে, যার মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও রাসায়নিক পণ্য।
বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ‘বিপদ সংকেত’। কারণ ভারত নিজস্ব তুলা ও সুতায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ এমনিতেই কম। তার ওপর ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তি কার্যকর হলে এবং ২০২৯ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়বে।
গত ২৭ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে এই চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইইউর সঙ্গে ভারতের এফটিএ চুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ভারত তখন ইইউভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা এখন বাংলাদেশ পাচ্ছে। ভারত মেশিনারিজ ও কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যেখানে বাংলাদেশকে প্রায় সবই আমদানি করতে হয়।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ২০২৭ সাল থেকে ভিয়েতনামও ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। একদিকে ভারত ও অন্যদিকে ভিয়েতনাম শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে এবং ২০২৯ সালে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে গেলে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কেন এখনো ইইউর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা শুরু করছে না, তা বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ ও সরকারের অদক্ষতা
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের কোনো রূপরেখা আছে বলে মনে হয় না। এলডিসি উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস বা এফটিএ নিশ্চিত করতে না পারলে ইউরোপে বাংলাদেশকে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। তখন ভারতের শূন্য শুল্কের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যাবে না।
তিনি সরকারের নেগোসিয়েশন টিমের অদক্ষতার সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের হয়ে কথা বলার মতো দক্ষ লোক নেই। অনেক ক্ষেত্রে কৃষি বা ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নেগোসিয়েশনে পাঠানো হয়, যাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভারত ২০ বছর ধরে আলোচনার পর এই চুক্তি করেছে, আর আমরা এখনো আলোচনাও শুরু করতে পারিনি। ভারতের নিজস্ব তুলা আছে, যা তাদের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও কমবে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ১ হাজার ৮৩১ কোটি ইউরোর পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে ভারত করেছে ৪১৮ কোটি ইউরো। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও, ভারতের ওপর ৯-১২ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এফটিএ কার্যকর হলে ভারতের এই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, এখনই দক্ষ নেগোসিয়েশন টিম গঠন করে জিএসপি প্লাস সুবিধা আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০২৯ সালের পর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস নামতে পারে।
