ভোটের আগে জ্বালানি খাতে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি, নেই অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের রূপরেখা


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজ নিজ অবস্থান থেকে খাতটি সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই খাতের যে বিপুল আর্থিক ঘাটতি, তা কীভাবে মেটানো হবে—সে বিষয়ে কোনো দলেরই সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। বিশেষ করে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে স্বনির্ভরতা আসবে এবং বিশাল ঋণের বোঝা কীভাবে লাঘব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক ঘাটতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বেশি। গত অর্থবছরে এই খাতে সরকারের ভর্তুকি গেছে প্রায় সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা, এরপরও বিপিডিবির নিট লোকসান ১৭ হাজার কোটি টাকা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, এই ঘাটতি কমাতে নির্বাচনের পরপরই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) যাবে সংস্থাটি। গত ২৯ জানুয়ারি কমিশনের এক গণশুনানিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা এমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন। উচ্চমূল্যের গ্যাস ও তেল আমদানির কারণেই মূলত এই সংকট তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি এখনো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেনি। তবে দলটির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, তাদের ঘোষিত ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ই হবে ইশতেহারের ভিত্তি। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দায়মুক্তি আইন বাতিল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “ক্ষমতায় গেলে বিএনপি শুরুতেই স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেবে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ তৈরি করা চুক্তিগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সম্প্রতি এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান উত্তরাবাসীর গ্যাস সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, “দেশে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের কাজে অতীতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।”

জামায়াতের ৩ বছর দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গত ২০ জানুয়ারি এক পলিসি সামিটে ঘোষণা দিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে আগামী তিন বছর সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়াবে না। তবে বিপিডিবির বর্তমান বিপুল লোকসানের মুখে এটি কীভাবে সম্ভব হবে, তার কোনো কারিগরি ব্যাখ্যা মেলেনি।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, “এ খাতে আমাদের মূল সমস্যা দুর্নীতি। এটি যদি বন্ধ করতে পারি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে দাম কমে যাবে।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’-এ জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি মিশ্রণের ওপর জোর দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। এছাড়া শিল্প খাতে বিদ্যুতের ট্যারিফ কমানো এবং সরকারি স্থাপনায় রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

এনসিপির পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের সদস্য আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, “আমাদের জ্বালানি নীতিতে বহুমুখীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাঁচ বছরের মধ্যে ৪০ শতাংশ যানবাহনকে ইলেকট্রিক যানে (ইভি) রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

দেশে বর্তমানে প্রতি বছর তেল, গ্যাস ও কয়লা মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানি হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারলেও সমাধানের বাস্তবসম্মত পথ দেখাচ্ছে না। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আইনি সুরাহা কীভাবে হবে, গ্যাসের জোগান কোত্থেকে আসবে এবং বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি কীভাবে সমন্বয় করা হবে—সে বিষয়ে দলগুলোর পরিকল্পনায় ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তাদের মতে, কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আর্থিক ও কারিগরি রোডম্যাপ।