‘গণভোট কি আই বুঝি না’—নোয়াখালীর গ্রামজুড়ে অজ্ঞতা, সরকারি প্রচারে শুধুই ব্যানার


“আই কোনদিন বাজারো জাইনো। আর জামাই বেগ্গেইন করে। হুইনচি ভোট হইবো। হাতপাখা, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা মার্কার কথা হুইনচি। গণভোট কি আই হেডা বুঝি না। আমনেরতুন হবে হুইনচি।”—কথাগুলো নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভার শিমুলিয়া নোয়াবাড়ীর ৬০ বছর বয়সী বাসিন্দা নুরুন নাহার বেগমের। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

শুধু নুরুন নাহার নন, সোনাইমুড়ীর নদনা ইউনিয়নের আতর মিয়া মিজি বাড়ির ১৫টি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যেরই একই অবস্থা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ক গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু গণভোটের প্রচারণাতেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ হাজার কোটি টাকার এই কর্মযজ্ঞের ছিটেফোঁটাও পৌঁছেনি প্রান্তিক ভোটারদের কানে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাইমুড়ী উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ে গণভোট নিয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। উপজেলা পরিষদ ভবনে টানানো গুটিকয়েক ব্যানারেই সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রচারণা। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রার্থীর প্রচারণায় ব্যস্ত থাকলেও গণভোটের বিষয়বস্তু—যেমন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কী, সংবিধানের কোথায় সংস্কার আনা হচ্ছে বা এর ফলে রাষ্ট্রে কী পরিবর্তন আসবে—সে সম্পর্কে ভোটাররা অন্ধকারে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে স্বচ্ছ কোনো ধারণা নেই।

নির্বাচন কমিশনের বাজেট শাখার তথ্যমতে, গণভোটের প্রচারে ছয়টি মন্ত্রণালয় প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যবহার করবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, তারা কোনো বরাদ্দ বা সচেতনতামূলক কাজের নির্দেশনা পাননি।

একই চিত্র সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও। তারা খরচ করছে ৪৬ কোটি টাকা। অথচ সোনাইমুড়ী উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্বশীল সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রচারণার বিষয়ে তিনি কোনো লিখিত নির্দেশনাই পাননি।

অন্যান্য দপ্তরের মধ্যে সমাজসেবা অফিস ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ও কোনো বিশেষ বরাদ্দ পায়নি। তারা নিজস্ব খরচে দু-একটি সভা বা ব্যানার টাঙিয়ে দায়িত্ব সেরেছেন। তথ্য ও ধর্ম মন্ত্রণালয় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পেলেও মাঠে তাদের কোনো তৎপরতা নেই।

গত ২৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের এক চিঠিতে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে পারবেন, কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের জন্য আহ্বান জানাতে পারবেন না। এই চিঠির পর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা দোটানায় পড়ে প্রচার কার্যক্রম আরও কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরিন আকতার বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে। প্রচারণার জন্য উপজেলা পরিষদের ফান্ড থেকে বাজেট দেওয়া হয়েছে।” সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আপনারা যাদের জিজ্ঞেস করেছেন, হয়তো আমাদের স্যাম্পলের সঙ্গে ওটা ম্যাচ হয়নি, তবে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে।”

নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার। ভোটের আর মাত্র ৯ দিন বাকি। অথচ ১৪০ কোটি টাকার প্রচার বাজেটের সুফল যদি মাঠ পর্যায়ে না পৌঁছায়, তবে এই ঐতিহাসিক গণভোট কতটুকু ফলপ্রসূ হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন সচেতন মহলের।