
দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঢেলে সাজানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। সারা দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় ৬৫ শতাংশই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপরই বসানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোটের দিন যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা হলেও তাদের অতীত ‘আমলনামা’ যাচাই করা হচ্ছে কঠোরভাবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের আগে ও পরে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিশছেন—সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি তাদের পেছনে গোয়েন্দা লাগানো হয়েছে। পুলিশের সব ইউনিটকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের এবার দূরে রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু জনবল সংকট ও বাস্তবতার কারণে কাউকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে তাদের ওপর থাকবে সর্বোচ্চ সতর্কতা।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের পুরো আমলনামা আমাদের কাছে আছে। কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে দায়িত্বে রাখা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্যকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আইজিপি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভোটকেন্দ্র ও বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা থাকবেন, তাদের কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা যাবে না। কারো পক্ষে কাজ করার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য আত্মগোপনে আছেন, অনেকে আটক হয়েছেন। ফলে পুলিশের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বাধ্য হয়েই বিতর্কিত আমলের কিছু কর্মকর্তাকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দিতে হচ্ছে। তবে কোনো সদস্য প্রার্থীর সঙ্গে আঁতাত করলেই তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হবে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি শুরু করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সূত্র জানায়, এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পৌনে ১৩ কোটি ভোটার দুটি করে ভোট দেবেন। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে পৌনে ৩ লাখ ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সব মিলিয়ে ভোটের নিরাপত্তায় সাত লাখের বেশি সদস্য মাঠে থাকবেন। এর মধ্যে আনসার-ভিডিপি সদস্যই থাকবেন সাড়ে ৫ লাখ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য থাকবেন প্রায় ৯০ হাজার।
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ইতিমধ্যে খুলনা, গাজীপুর, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার পরিবর্তন করা হয়েছে। বদলি করা হয়েছে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও ৫২৭ থানার ওসিকে। ডিএমপির সব ওসি পদেও রদবদল আনা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের জেরে বিপর্যস্ত পুলিশ বাহিনীকে গুছিয়ে এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়া এবং জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া নিয়ে পুলিশের মধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, পুলিশ নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
