ভোটের মাঠে এআই আতঙ্ক: আমরা কতটুকু নিরাপদ?

নজরুল কবির দীপু
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচন মানেই আমাদের দেশে এক অন্যরকম উৎসব, চায়ের কাপে ঝড় আর পাড়ায় পাড়ায় তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু এবারের নির্বাচনের আবহটা যেন একটু অন্যরকম, কেমন যেন একটা অজানা শঙ্কা কাজ করছে মনের ভেতর। আগে আমরা ভয় পেতাম মাঠের সহিংসতা, লাঠিসোঁটা আর পেশিশক্তিকে। কিন্তু এবার ভয়টা অদৃশ্য, অথচ অনেক বেশি শক্তিশালী।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি আর ভয় ততই বাড়ছে। এই ভয়টা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা দেখছি, প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের ঘায়েল করতে কিংবা নিজের দলের সাফাই গাইতে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে ‘ডিপফেক’ বা ‘চিপফেক’ ভিডিও। বিষয়টা শুনলে মনে হতে পারে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার গল্প, কিন্তু এটাই এখন আমাদের রূঢ় বাস্তবতা।

আমরা যারা সাধারণ ভোটার, আমাদের কাছে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, সেটা আলাদা করা দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে হুবহু কারও চেহারা ও কণ্ঠ নকল করে এমন সব ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওটা আসলে নকল। আবার সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে সংবাদপত্রের লোগোসহ ফটোকার্ড নকল করে—যাকে বলা হচ্ছে ‘চিপফেক’—ভুয়া বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতির মাঠে একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার আগেও ছিল, কিন্তু প্রযুক্তির এই অপব্যবহার মিথ্যাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, নিজের চোখ ও কানকেও এখন আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল সাক্ষরতার হার একেবারে তলানিতে। গ্রামের একজন সহজ-সরল মানুষ যখন ফেসবুকে তার পছন্দের নেতার কোনো ভিডিও দেখেন, তিনি সেটাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেন। তিনি জানেন না যে, ওটা কোনো কম্পিউটারের কারসাজি হতে পারে।

সম্প্রতি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিস ল্যাবের এক বিশ্লেষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। তারা দেখিয়েছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো দেদারসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভিডিও বানাচ্ছে এবং তা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ভয়ের ব্যাপার হলো, এসব ভিডিও যে এআই দিয়ে বানানো, তা দর্শকদের জানানো হচ্ছে না।

ডিসমিস ল্যাবের তথ্যমতে, কেবল জানুয়ারি মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত ফেসবুকে এ ধরনের ৮০০টি ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ ভিডিওতেই কোনো লেবেল বা চিহ্ন ব্যবহার করা হয়নি, যা দেখে বোঝা যাবে এটি কৃত্রিম। ইউটিউবের অবস্থা আরও খারাপ, সেখানে পাওয়া ১৮১টি ভিডিওর ৯৪ শতাংশের ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহারের কথা গোপন রাখা হয়েছে। আর টিকটকের কথা তো বলাই বাহুল্য, সেখানে ৫০টি ভিডিওর একটিতেও কোনো সতর্কবার্তা ছিল না। অর্থাৎ, আমরা যা দেখছি, তার বড় একটা অংশই সাজানো নাটক।

বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, আর্জেন্টিনা কিংবা তুরস্কের মতো দেশগুলোতেও সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার ভোটারদের মতামতকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। একটি অতি বাস্তবসম্মত ভুয়া ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারে, সমাজের শান্তি নষ্ট করতে পারে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এমনিতেই চরমে, সেখানে এই ডিজিটাল সহিংসতা বা অপতথ্য আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করতে পারে। আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য মাঠের সহিংসতার চেয়েও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই ডিজিটাল জগতের সহিংসতা।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বা আরপিওতে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক বা মানহানিকর কোনো কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনী আচরণবিধিতেও এ নিয়ে কড়াকড়ি আছে। কিন্তু আইনের বইয়ে লেখা আর বাস্তবের প্রয়োগের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

আইন থাকলেই তো হলো না, সেটা মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের বা ইসির। আমরা মনে করি, শুধু আইন সংশোধন করলেই ইসির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চোখের সামনে আচরণবিধির এমন স্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে, হাজার হাজার ভুয়া ভিডিও ঘুরছে অনলাইনে, অথচ অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

উল্টো আমরা দেখলাম এক ভয়াবহ ঘটনা। গত শনিবার নির্বাচন কমিশনের চালু করা অনলাইন ব্যবস্থায় এক গুরুতর ত্রুটির কারণে অন্তত ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। ভাবা যায়? যারা নির্বাচন কাভার করবেন, সেই সাংবাদিকদের তথ্যই যদি সুরক্ষিত না থাকে, তবে সাধারণ নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা কোথায়? নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে ইসি আসলে কতটা সতর্ক ও দায়িত্বশীল, তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগাটা কি খুব অযৌক্তিক?

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, সেটাও আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তারা মনে করেন, নির্বাচনে শুধু ডিপফেক ভিডিওই একমাত্র হুমকি নয়, সাইবার আক্রমণের ব্যাপারেও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। হ্যাকাররা ওৎ পেতে আছে। তার ওপর আছে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের দৌরাত্ম্য। তাদের অনেকেই কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই, অথবা নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করছেন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বক্তব্য আমাদের সামাজিক বিভাজনকে আরও উসকে দিচ্ছে, ভাইয়ে-ভাইয়ে অবিশ্বাস তৈরি করছে। অনলাইনে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়লে বাস্তবে তার রেশ ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে কতক্ষণ লাগে, তা আমরা অতীতেও দেখেছি।

এই পরিস্থিতিতে আমরা যারা আমজনতা, আমরা আসলে কার দিকে তাকাব? আমরা মনে করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা এসব ভুয়া ভিডিও আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যেন নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, তার জন্য ইসিকে এখনই ঘুম ভাঙতে হবে। লোক দেখানো সতর্কতা নয়, সর্বোচ্চ সজাগ হওয়া প্রয়োজন। তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে এই ডিজিটাল জঞ্জাল তারা সরাতে পারেন।

একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীদেরও বুঝতে হবে, ক্ষমতার লোভে মিথ্যাকে আশ্রয় করে হয়তো সাময়িক ফয়দা লোটা যায়, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। তাদের অনলাইন প্রচারণার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে, কঠোরভাবে আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।

দিনশেষে, প্রযুক্তির এই কালো থাবা থেকে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকদেরও চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, যাচাই না করে কোনো কিছু বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নতুবা, রোবটের বানানো মিথ্যার কাছে আমাদের সত্যের মৃত্যু ঘটবে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।