খুলনা : একসময়ের স্কুলশিক্ষক মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ পূর্ণমন্ত্রী হচ্ছেন। এর মধ্যেই শপথ গ্রহণের জন্য তাঁর ডাক পড়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিনিসহ চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করবেন। তার সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে ডাক পড়েছে আরও যে তিনজনের। তারা হলেন-খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শাহজাহান কামাল, রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী।
এদিকে, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ মন্ত্রী হচ্ছেন এ খবরে তার খুলনা-৫ আসনের সংসদীয় আসনের জনসাধারণের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। সোমবার সন্ধ্যায় এই খবর জানাজানি হওয়ার পর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মানুষ আনন্দ মিছিল ও মিষ্টিমুখ করছেন।
তৃণমূল থেকে ধাপে ধাপে উঠে আসা নায়ায়ণ চন্দ্র চন্দ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের অধিকারী। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার উলা গ্রামের চন্দ বংশের কালীপদ চন্দের মেজো ছেলে নারায়ণ চন্দ্র চন্দের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১২ মার্চ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং ১৯৬৭ সালে একই বিষয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েই নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ডুমুরিয়ার উপজেলার সাহস নোয়াকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে ডুমুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একটানা প্রায় ঊনচল্লিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন।
১৯৬৭ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে ডুমুরিয়া থানা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৮৪ সালে সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৫ সালে ডুমুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদে এখনো তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগ খুলনা জেলা কমিটির নির্বাহী সদস্য। নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলাদেশের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ডুমুরিয়া উপজেলার ভাণ্ডারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। এর পর একটানা ছয় বার একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালাহউদ্দিন ইউসুফের মৃত্যুর পর ২০০০ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি চারদলীয় জোট প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সদ্য সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সোমবার দুপুরে মন্ত্রীপরিষদ সচিবের কাছ থেকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার ফোন পান নারায়ণ চন্দ্র চন্দ।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ সচিব আজ (সোমবার) দুপুরে আমাকে ফোন করেছিলেন। আগামীকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলে আমি প্রথমেই গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাবো। শ্রদ্ধা জানাবো মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি। মন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম দায়িত্ব হবে সরকারের সাফল্যকে এগিয়ে নেওয়া। এ মন্ত্রণালয়ের অনেক সফলতা এসেছে গত চার বছরে। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। এটিই হবে আমার প্রথম কাজ।’
নারায়ণ চন্দ্র চন্দ আরও বলেন, ‘আজ আমার এই অবস্থানের জন্য আমার এলাকার জনসাধারণের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে একজন শিক্ষক থেকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। আমি ৩৯ বছর শিক্ষকতা শেষে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগ করে রাজনীতিতে এসেছি। সত্যিই যদি আমি কাল পূর্ণমন্ত্রী হই, তাহলে তা হবে আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করার চেষ্টা করেছি। আগামীতেও করবো।’
মন্ত্রীসভার এই রদবদলে রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, রাষ্ট্র-সমাজে গেড়ে বসা তদবির ও বিকিকিনির সংস্কৃতিতে এই এক দারুণ খবর, আশাজাগানিয়া গল্প। সমস্ত মোহ, লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের মেধাবীজনদের সার্চ করে নিয়ে আসা, তাদের উপর গুরুদায়িত্ব অর্পণ করার দৃষ্টান্ত কেবল একজনই স্থাপন করতে পারেন; আর তিনি হলেন জাতির গৌরবের ঠিকানা- মেধানুরাগী, মেধাবী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
