সীমান্তে গুলিতে নিহত শিশু হুজাইফার বিদায়: জানাজায় এক কাতারে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থী


মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা গুলিতে বিদ্ধ হয়ে দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানল শিশু হুজাইফা সুলতানা (৯)। আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শোকাবহ এই জানাজায় রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে অংশ নেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের বিএনপি ও জামায়াতের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী এবং জামায়াত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির নুর আহমদ আনোয়ারী। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জানাজার মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধের দাবি জানান এবং শিশু হুজাইফার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, হুজাইফার জানাজায় ভিন্ন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে কোনো দলীয় প্রতীক ছিল না, ছিল শুধুই শোকের আবহ। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন, যা এলাকাবাসীর মনে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা জুগিয়েছে।

জানাজার মাঠে হুজাইফার বাবা জসিম উদ্দিনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ‘হুজাইফা আমার বড় সন্তান। মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ শুনে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে উঠানে গিয়েছিল, তখনই হঠাৎ গুলি এসে লাগে। যে মাঠে খেলাধুলায় মগ্ন থাকত হুজাইফা, আজ সেই মাঠের পাশের কবরস্থানেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো। বাবা হিসেবে মেয়ের এমন মৃত্যু সহ্য করার মতো নয়।’

গত ১১ জানুয়ারি সকালে হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা, আরএসও ও নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে তীব্র গোলাগুলি চলছিল। একই সময়ে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীও বিমান হামলা চালায়। ওই সময় সীমান্ত পেরিয়ে আসা একটি গুলি হুজাইফার মাথায় বিদ্ধ হয়। সে স্থানীয় একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

ঘটনার পরপরই তাকে প্রথমে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) আইসিইউতে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে (নিনস) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। শনিবার গভীর রাতে মরদেহ বাড়িতে আনা হয়।

চমেক হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ এর আগে জানিয়েছিলেন, গুলিটি শিশুটির মস্তিষ্কে প্রবেশ করায় তার অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করলেও ঝুঁকির কারণে মস্তিষ্কের গভীরে ঢুকে যাওয়া গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, ১১ জানুয়ারি সীমান্তের ওপারে সংঘাতের সময় রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিটিই কেড়ে নিল হুজাইফার প্রাণ। এ ঘটনায় সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।