
আধ্যাত্মিক নগরী খ্যাত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও হেফাজত ইসলামের অস্থায়ী কার্যালয় এবং এশিয়ার বৃহত্তম রাবার বাগানের জন্য পরিচিত চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফটিকছড়িতে এবার বড় ধরনের ভাগ বসাতে চাইছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ বা তাদের শরিকদের প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা না থাকায় ভোটের মাঠে মূল লড়াইটা ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ফটিকছড়ি ও ভূজপুর থানা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে তারা ভোট ও দোয়া চাইছেন।
২০০৮ সালে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খাদিজাতুল আনোয়ার সনি এমপি হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থাকায় এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই আসনটি নিজেদের করে নিতে মরিয়া।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নুরুল আমিন। এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদিন মাইজভাণ্ডারী (একতারা), গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জুলফিকার আলী মান্নান (হাতপাখা), জনতার দলের মো. গোলাম নওশের আলী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আহমেদ কবির (ফুটবল) ও জিন্নাত আকতার (হরিণ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকে ঋণখেলাপির মামলা নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে হাইকোর্ট, সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই শেষে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। তবে আদালতের নির্দেশে তাকে বিজয়ী হলেও ফলের জন্য আগামী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সব বাধা পেরিয়ে তিনি এখন পুরোদমে প্রচারণায় ব্যস্ত।
নিজের অবস্থান তুলে ধরে সারোয়ার আলমগীর বলেন, “একটি পক্ষ আমাদের আদালতে আটকে রেখে ক্ষমতার দিবাস্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না। হামলা-মামলা যা-ই হোক, বিএনপির বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। জনগণই আমাদের ক্ষমতার উৎস।” নির্বাচিত হলে উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ওমর ফারুক বলেন, উর্বর এই আসনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে তাদের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন এবং প্রমাণ করবেন ফটিকছড়িবাসী জিয়ার আদর্শের অনুসারী।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে এবার চমক দেখাতে চায়। দলটির নেতারা মনে করছেন, সুষ্ঠু ভোট হলে এবং আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বা সাধারণ ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানা গেলে জয় অসম্ভব নয়।
জামায়াতের প্রার্থী মো. নুরুল আমিন বলেন, “ভোটাররা অনুকূল পরিবেশ পেলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমাদের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। প্রতিটি কর্মীই আমাদের একেকটি খুঁটি।” তিনি নির্বাচিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির আশ্বাস দেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. নাজিম উদ্দীন ইমু দাবি করেন, জামায়াত একটি পরিশীলিত দল এবং তাদের প্রার্থী মার্জিত ও শিক্ষিত হওয়ায় জয়ের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন অন্য প্রার্থীরাও। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী সৈয়দ সাইফুদিন মাইজভাণ্ডারী বলেন, সুন্নিয়ত ও ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করতে একতারার বিকল্প নেই। গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম নিজেকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি উল্লেখ করে ভোটারদের ভালোবাসা ও ভোট প্রত্যাশা করেন।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. জুলফিকার আলী মান্নান বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সরব ছিলেন। তারুণ্যের প্রথম ভোট হাতপাখায় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও একমাত্র নারী প্রতিদ্বন্দ্বী জিন্নাত আকতার বলেন, নারীদের অধিকার নিশ্চিতে তিনি হরিণ মার্কায় ভোট চান।
উপজেলার বাসিন্দারা তাদের নতুন জনপ্রতিনিধির কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, হালদা ও ধুরুং খালের ভাঙ্গন রোধ এবং গ্যাস সরবরাহের দাবি জানাচ্ছেন।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫১ হাজার ৯৪২ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২৮ হাজার ৮৪১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ১ জন ভোটার রয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ১৪০টি ভোটকেন্দ্রের ৯০০টি ভোটকক্ষে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
