কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনটি বরাবরই জামায়াতে ইসলামীর ‘শক্ত ঘাঁটি’ বা ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। দলের হেভিওয়েট প্রার্থী ও সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদের প্রার্থিতা ঘিরে এবারও প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু ভোটের বাক্সে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর ফলাফলে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ধানের শীষ প্রতীকে আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের হামিদুর রহমান আজাদ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট। অর্থাৎ ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী। ভোটের এই ব্যবধান এবং ফলাফলের ধরন স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের মতো শীর্ষ নেতার এমন বড় ব্যবধানে পরাজয় বেশ বিস্ময়কর। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ফলাফলের জন্য জামায়াত নেতাকর্মীদের অনেকেই প্রস্তুত ছিলেন না। বিশেষ করে মহেশখালীতে দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জামায়াত কর্মী জানান, অঘোষিতভাবে আওয়ামী লীগের কিছু ভোটও তাদের বাক্সে আসবে বলে ধারণা ছিল তাদের। কিন্তু ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধান প্রমাণ করে সাধারণ ভোটাররা এবার এককভাবে বিএনপি প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকেছেন। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এই ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে দুই দলের মধ্যেই পালাবদলের সংস্কৃতি চালু রয়েছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই হামিদুর রহমান আজাদই আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনসারুল করিমকে ১৭ হাজার ২৭ ভোটে হারিয়ে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। অথচ ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র বদলে গেল।
অন্যদিকে বিএনপির আলমগীর ফরিদের জন্য এটি হারানো আসন পুনরুদ্ধারের নির্বাচন ছিল। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী সিরাজুল মোস্তফাকে ১২ হাজার ভোটে এবং ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে ৫৪ হাজার ৩১৩ ভোটে হারিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর এই বড় জয় প্রমাণ করে এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো অটুট।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৭টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অতীতের সহিংস ইতিহাসের কারণে ভোটারদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় কোনো বড় ধরনের সংঘাত বা প্রাণহানি ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সকাল থেকেই কেন্দ্রে ভোটারদের, বিশেষ করে নারী ও তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫১ জন ভোটারের এই আসনে (পুরুষ ২,০৬,৪৫৩ ও নারী ১,৮১,৩৯৮) শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকায় সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।
ফলাফল ঘোষণার পর বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের উল্লাস আর জামায়াত শিবিরের নীরবতা মহেশখালীর রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রায় ৬৯ হাজার ভোটারের সমর্থন পাওয়া জামায়াত নেতারা যদিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংগঠন গোছানোর কথা বলছেন, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন জোটবদ্ধ রাজনীতির বাইরে এসে এককভাবে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কৌশলগত ঘাটতি ছিল তাদের।
অন্যদিকে আলমগীর ফরিদের এই বিজয় আগামী দিনে কক্সবাজারের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থানকে আরও সংহত করবে। এখন দেখার বিষয় এই বিশাল জয়ের ম্যান্ডেট নিয়ে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উন্নয়নে নতুন সাংসদ কী ভূমিকা রাখেন।

