তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবেন?


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক অভাবনীয় ও নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত শুক্রবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের যে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে, তাতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো ২১২টি আসন নিশ্চিত করেছে। এটি কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক দলিল। জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গনির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত রায় বিএনপিকে যে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার জন্য দলটিকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই বিজয় যেমন আনন্দের, তেমনি এটি এক বিশাল দায়িত্বেরও বার্তাবাহক।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, সারা দেশে যে শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও পরিচ্ছন্ন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। অতীতের সংঘাতময় নির্বাচনী সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে এমন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

আমরা দেখেছি, নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারির ফলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। তবে কেবল প্রশাসনিক তৎপরতাই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকাও এই পরিবেশ তৈরিতে বড় অবদান রেখেছে। আমরা মনে করি, এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমাদের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার একটি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, এমনটাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা।

নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোটের হার ছিল ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গণভোটের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের মানুষ আমূল সংস্কারের পক্ষেই রায় দিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি, যার বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। এই বিপুল সংখ্যক ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রমাণ করে যে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ যে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তারা নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। এই মসৃণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার যে অসামান্য আত্মত্যাগ বাংলাদেশকে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিল, তার সার্থক রূপায়ণ ঘটতে যাচ্ছে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। একটি পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়েছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি ছিল। ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্যতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের যে ক্ষত বর্তমানে বিদ্যমান, তা সারিয়ে তুলতে একটি স্থিতিশীল সরকারের কোনো বিকল্প ছিল না। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির সামনে এখন সেই কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীল সরকার গঠনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংসদে একক আধিপত্য থাকার কারণে সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা অনেক সহজ হবে, যা সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতি সঞ্চার করবে বলে আমরা আশা করি। একই সঙ্গে প্রত্যাশা থাকবে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরিবর্তনের যে বিশাল জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্র পরিচালনাকে যেমন সহজ করে, তেমনি এর ঝুঁকিও কম নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংসদে বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থান এবং সরকারি দলের একক আধিপত্য অনেক সময় সরকারকে কর্তৃত্বপরায়ণ করে তোলে। ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে জবাবদিহির জায়গাটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আমরা আশা করব, বিএনপি সরকার গঠনের শুরু থেকেই এই ঝুঁকির বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে। অতীতে আমরা দেখেছি বিশাল ম্যান্ডেট কীভাবে অহমিকার জন্ম দিতে পারে, তাই এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি জনগণ দেখতে চায় না। গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং সব মত ও পথের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার মাধ্যমে বিএনপি সরকারের ওপর রাষ্ট্র সংস্কারের এক গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আগামী সংসদের প্রথম ১৮০ দিন হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকাও পালন করবে। এটি একটি ঐতিহাসিক ও জটিল প্রক্রিয়া।

আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিএনপি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না। বরং তারা বিরোধী দলগুলো এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতা বা মীমাংসার পথ বেছে নেবে। জাতীয় সংসদকে কেবল আইন পাসের যন্ত্র না বানিয়ে, সেটিকে শুরু থেকেই তর্কবিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভিন্নমতকে দমন না করে ধারণ করার মানসিকতাই পারে একটি টেকসই গণতন্ত্র উপহার দিতে।

সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, এই প্রক্রিয়ার কোনো ব্যত্যয় ঘটা মানেই দেশে পুনরায় বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনা। আর তেমনটি হলে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর শুরু হয়েছে, তা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে নতুন গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়, বরং বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ—সবার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার জনগণের এই বিপুল প্রত্যাশার ভার বহন করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে, এটাই আমাদের চাওয়া।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।