ঢাকা: বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারি এখন নির্জন-নীরব। দুদিন আগেও যেটি ছিল আলোঝলমলে, সেখানে আজ এক ভৌতিক পরিবেশ জেঁকে আছে। ঘোর লাগা অবস্থা সংশ্লিষ্ট এলাকাটিরও। আর্টিজান-কাণ্ডের ঘোরের মধ্যেই অদ্ভুত অস্বস্তি জুড়ে বসেছে আশপাশের বাসিন্দাদের ভাগ্যে।
তাদের বাড়ির সামনে পুলিশ। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বুটের মচমচ আওয়াজ। যাতায়াত আর নিরাপত্তার কড়াকড়ি।
মাত্র দুদিন আগে এখানে যে বাংলাদেশ দেখেছে তার ইতিহাসে নজিরবিহীন এক রক্তাক্ত রাত। বাকরুদ্ধ করে দেয়া এক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে এখানকার হলি আর্টিজান বেকারিতে।
শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকেও টেবিলে টেবিলে চলছিল আড্ডা, সুসাদু খাবারের সুবাসে ম-ম করছিল আঙিনা। এখন আর্টিজানের বাতাসে রক্তের গন্ধ, স্থানে স্থানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।
হামলা আর অভিযানে প্রায় বিধ্বস্ত হলি আর্টিজানের সামনে ভাঙাচুরা ধ্বংসস্তূপ। সাঁজোয়া গাড়ির চাকার দাগ সবুজ আঙিনায়। বাইরের অংশে লেক ভিউ ক্লিনিকের পার্কিংয়ে রাখা একটি দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ি, যেটি অভিযানের সময় আর্টিজানের সামনে ছিল।
সেখানে এখন কেউ ঢুকতে পারে না। রবিবার দুপুরের দিকে সিআইডির লোকজন একবার ঘুরে গেছে। এ ছাড়া কয়েকজন পুলিশ সদস্য পাহারা দিচ্ছে আর্টিজান। আর কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই সেখানে।
শুধু আর্টিজান নয়, এক অর্থে সুমসান পুরো এলাকাটিই। জঙ্গি হামলার পর আর্টিজানের আশপাশের মানুষের জীবনে গত শুক্রবার দিন শেষে একটি রাত গেছে বটে! দুঃস্বপ্নে তাড়া করা এক অশুভ রাত। গুলি-বোমায় প্রকম্পিত রাতের পর একই রকম সকাল দেখেছে তারা। সেই দুঃস্বপ্ন এখনো শেষ হয়নি তাদের।
এখন এই এক দিন পর জঙ্গিমুক্ত সময়ে নতুন দুঃস্বপ্ন পার করছে তারা। ঘরের বের হলেই পড়তে হচ্ছে পুলিশের মুখে। স্থানে স্থানে পুলিশ, রাস্তার মাথায় পুলিশের ব্যারিকেড। অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে থামাচ্ছে লোকজনকে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি শেষে সন্তুষ্ট হলে মিলছে যাওয়ার অনুমতি। বাইরে থেকে কেউ এলাকায় ঢুকতে চাইলে আরও বেশি কড়াকড়ি। পরিচিত কাউকে ডেকে এনে তারপর যেতে হচ্ছে ভেতরে।
এসব কড়াকড়ির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী। অনেক বাসায় কাজের লোকজন যেতে পারছেন না। বাসা থেকে ঈদের বাজার করতে বেরোতেও স্বস্তি বোধ করছেন না অনেকে। বাইরে থেকে কেউ কেনাকাটা করে এলে ব্যারিকেডে এসে ব্যাগ-প্যাকেট খুলে দেখাতে হয়্ সেখানে কী আছে। তা তিনি নারী হন আর পুরুষ।
পুরোপুরি বন্ধ গাড়ি চলাচল। কাউকে কোথাও যেতে হলে তাকে হেঁটে এলাকা পার হতে হয়। তাই খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ বাসার বাইরে যাচ্ছেন না।
এদিকে তো যা হোক চাইলে বাইরে বেরোনো যায়, কিন্তু বেকারির ওদিকে ওয়াকওয়েতে সাধারণের চলাচল বন্ধ। সেখানে পুলিশের টহল চলছে সারাক্ষণ।
হলি আর্টিজানে হামলা করে ২২ প্রাণই শুধু কাড়ল না জঙ্গিরা, সঙ্গে অস্বাভাবিক করে দিয়ে গেছে এর আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন। প্রাণময় পথঘাটে এখন ভুতুড়ে নীরবতা। হাতে গোনা যে কজন ঘরের বার হচ্ছেন, তাদের মুখে রাজ্যের অন্ধকার।
দুদিন বাদে ঈদুল ফিতর। আর্টিজান এলাকার মানুষের জীবনে এই অদ্ভুত নীরবতা, অস্বাভাবিক অস্বস্তি কবে কাটে কে জানে!
