
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি চুড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে বিএনপি। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গঠিত হতে যাওয়া নতুন মন্ত্রিসভায় দলের প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি নবীনদেরও জায়গা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজপথের যুগপৎ আন্দোলনে সঙ্গে থাকা শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও স্থান পেতে যাচ্ছেন নতুন সরকারে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান ও আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি দেখভাল করছেন।
শনিবার বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, এবারের মন্ত্রিসভায় সদস্য সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে। সর্বশেষ ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের সময় ৬০ সদস্যের মন্ত্রিসভা করেছিল। এবারও আকার তেমনই হতে পারে। বিশেষ চমক হিসেবে সরকারে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অথবা বিশেষ সহকারী করা হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়েই সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর শপথের পর তাঁর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনে গতি আনা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যেই মন্ত্রিসভায় তরুণদের অন্তর্ভুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিগত বিএনপি সরকারের সময় যেসব মন্ত্রণালয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল, সেসব জায়গায় পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
নির্বাচনে জয়ের পর শুক্রবার ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে দলের চেয়ারম্যানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পর স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। বৈঠকে শপথগ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রিসভা গঠন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিএনপির কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চেয়ারম্যান নিজেই করছেন। প্রয়োজনে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করছেন।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবীণ নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ড. আব্দুল মঈন খানকে পরিকল্পনা, মির্জা আব্বাসকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত, সালাহউদ্দিন আহমদকে সড়ক ও যোগাযোগ এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পররাষ্ট্র অথবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এছাড়া ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন স্বাস্থ্য এবং আব্দুল আউয়াল মিন্টু শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও মন্ত্রিসভায় থাকছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আরেকটি সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে দলের ভিন্ন চিন্তা রয়েছে, ফলে তিনি শুরুতে মন্ত্রিসভায় নাও থাকতে পারেন।
নতুন মুখের মধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে তথ্য ও সম্প্রচার (টেকনোক্র্যাট), ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন (টেকনোক্র্যাট), শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানকে আইন এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হককে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এছাড়া আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা এবং অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান হতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, মাহদী আমিন ও ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। সিলেট অঞ্চল থেকে আরিফুল হক চৌধুরী ও খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের শরীফুল আলম এবং জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারকে হারানো আলী আজগর লবিকেও মন্ত্রিসভায় রাখা হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে শরিক দলগুলো নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের যে ঘোষণা বিএনপি দিয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে মন্ত্রিসভায়।
আলোচিত শরিক নেতাদের মধ্যে ড. রেজা কিবরিয়াকে অর্থ মন্ত্রণালয়, ববি হাজ্জাজ, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর এবং মোস্তফা জামাল হায়দারকে (টেকনোক্র্যাট) মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।
