
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর পলিমাটির ভাঙা-গড়ার খেলায় মানচিত্র থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন ধলঘাটা। গত তিন দশকে এই জনপদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমি সাগরের পেটে চলে গেছে, যা এলাকার আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে পুরোপুরি তছনছ করে দিয়েছে।
জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ঘরবাড়ি আর লোনাপানির দাপটে বিবর্ণ প্রকৃতিই এখন এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার অদম্য জেদ থাকলেও সাগরের ক্রমাগত আগ্রাসনে অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াইয়ে লিপ্ত এই উপকূলীয় জনপদ।
সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের পূর্ব উপকূলীয় এই জনপদে সবুজের কোনো স্নিগ্ধতা নেই; চারদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ আর ধূসর প্রান্তর। লোনাপানির প্রভাবে গাছপালা মরে গেছে, কাঁচা রাস্তাগুলো বারবার বিলীন হচ্ছে। সাগরের ঢেউ লোকালয়ে আছড়ে পড়লে মুহূর্তেই সচ্ছল পরিবারগুলো ঘরহীন উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। জীবন ধারণের ন্যূনতম রসদ যেখানে অমিল, সেখানে জীবন সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপই যেন এক একটি যুদ্ধ।

স্থানীয় পরিসংখ্যান ও ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও উপকূলীয় সুরক্ষা বাঁধের দুর্বলতায় ধলঘাটার আয়তন দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এখানকার প্রায় ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ধুয়েমুছে গিয়েছিল। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার না হওয়ায় এলাকাটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর জোয়ারের পানি অনায়াসেই লোকালয়ে ঢুকে ফসল ও গবাদিপশু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ভিটেমাটি হারিয়ে ইতিমধ্যে ধলঘাটার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। এসব উদ্বাস্তু পরিবারের বড় একটি অংশ মহেশখালীর হোয়ানক, শাপলাপুর এবং কালারমারছড়া ইউনিয়নের উঁচু ভূমিতে কিংবা পার্বত্য জেলাগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মূল ভূখণ্ডের সুবিধা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা এই মানুষগুলোর পুনর্বাসনে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান নয়।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি ও তিন সন্তান হারানো সাবেক বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, সেই কালো রাতে সবকিছু হারিয়ে আজ তিনি অন্য এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু নাড়ির টানে বারবার ফিরে আসেন এই নোনাজলের তীরে।
অন্যদিকে প্রবীণ বাসিন্দা এজাহার মিয়া বলেন, তারা দয়া বা ত্রাণ চান না; তারা চান একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও টেকসই নিরাপত্তা। তিনি আক্ষেপ করে জানান, উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ না করে।
তবে এই বিষাদময় পরিস্থিতির বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে সরকারের নেওয়া মহাপরিকল্পনা। ধলঘাটায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর সম্প্রসারণ এবং এলএনজি টার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধলঘাটা একটি আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আধুনিক অবকাঠামো ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং ধলঘাটা ফিরে পাবে তার হারানো অর্থনৈতিক গুরুত্ব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধলঘাটার ভবিষ্যৎ এখন উন্নয়ন ও অস্তিত্বের এক সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। মেগা প্রকল্পগুলো যদি বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবেই বিশাল এই বিনিয়োগ সার্থকতা পাবে।
