
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করল দেশের জনগণ। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আগামীর বাংলাদেশের পথচলা শুরু হলো।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে দীর্ঘ তিন যুগ ধরে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন দুই নারী—বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। দীর্ঘ বিরতির পর তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে দেশ পেল একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনের ইতি টেনে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন তিনি।
তারেক রহমানের রাজনীতিতে অভিষেক ও উত্থান ছিল ঘটনাবহুল। ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মায়ের সঙ্গে দেশব্যাপী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিএনপির জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় তাকে কাটাতে হয়েছে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হন এবং ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে যান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তার মা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। মায়ের মৃত্যুর পর ৯ জানুয়ারি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তারেক রহমান এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
বিশ্ব রাজনীতিতে খুব অল্প কয়েকটি পরিবারই আছে, যাদের তিনজন সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবার সেই বিরল তালিকায় স্থান করে নিল। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা জিয়াউর রহমান এবং ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে এখন চালকের আসনে তাদের বড় ছেলে।
তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে রাজনৈতিক আবহ। তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান পেশায় চিকিৎসক এবং তাদের একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তবে এই আনন্দের দিনেও পরিবারটি স্মরণ করছে তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে, যিনি ২০১৫ সালে নির্বাসিত অবস্থায় অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
শপথ অনুষ্ঠানের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় দলের হাল ধরা, মামলা-হামলা ও নির্বাসন মোকাবিলা করে তারেক রহমান এখন রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায়। তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা এবং সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
