স্বপ্নের পালে নতুন হাওয়া


গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন সূচিত হলো। সারা দেশে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। আদালতের নির্দেশে ২টি আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে এবং ১টি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে পরবর্তীতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

আনন্দের বিষয় হলো, ফলাফল স্থগিত থাকা ওই দুটি আসনেও ধানের শীষের প্রার্থীরাই এগিয়ে ছিলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো দুটি আসন (বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দিয়ে তিনি ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের সেবা করবেন।

এর মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনায় দীর্ঘদিনের ‘দুই নেত্রী’ যুগের অবসান হলো। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ১৭ তারিখ বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশ প্রবেশ করল তারেক রহমানের যুগে। আজ থেকে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক তিন বারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান।

রাজনীতির এই পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ ও বেদনাবিধুর। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। পলাতক স্বৈরাচার ও খুনি হাসিনা গং তারেক রহমানের রাজনীতিতে ফেরা এবং দেশে আসার পথ রুদ্ধ করতে সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সুদৃঢ় নেতৃত্বগুণে দীর্ঘ দিন লন্ডন প্রবাসী হয়েও আজ বাংলাদেশের সফল ‘স্টেটসম্যানে’ পরিণত হয়েছেন তারেক রহমান। এটি এখন আর স্বপ্ন নয়, কঠিন বাস্তবতা। তবে আফসোস, এই মাহেন্দ্রক্ষণ দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া দেখে যেতে পারলেন না। গণতন্ত্রের মা ও আপোষহীন দেশনেত্রী খুনি হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বিনা চিকিৎসায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি ঐতিহাসিক ভূমিধস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এমন এক সন্ধিক্ষণে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে, যখন তাদের সামনে রয়েছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের কাঁধে থাকবে তলানিতে থাকা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সংকটাপন্ন অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক চাপে সমন্বিত কূটনীতি বজায় রাখা হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিএনপিকে নজিরবিহীন ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ঐতিহাসিক বিজয়কে পুঁজি করে তারেক রহমান কতটা দূরদর্শী নেতৃত্ব দেবেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশের আপামর জনসাধারণ। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের এই নতুন যাত্রায় নজর থাকবে বিশ্ব মিডিয়ারও।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম যেমন এ দেশের ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, আজ তারেক রহমানও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। পলাতক হাসিনা সরকারের মহা-লুটপাট, প্রশাসনের নগ্ন দলীয়করণ এবং বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমনকি লেকচারার নিয়োগ পর্যন্ত সর্বত্র দলীয়করণের বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে বসে থাকা এই দলীয় সুবিধাবাধীদের সামলে নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যাত্রা হবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

এছাড়া সরকারের সামনে রয়েছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া একচেটিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কে ভারসাম্য আনা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় দলীয়করণের অভিযোগে বিদ্ধ ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা বিএনপির জন্য এক প্রকার অগ্নিপরীক্ষা।

দেশের মানুষ বিএনপির ওপর যে আস্থা রেখেছে তা বাস্তবায়ন করা এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সমন্বয় ঘটানোই এখন দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ আজ নতুন করে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ শুরু করেছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে সামনে রেখে গত ৬ ফেব্রুয়ারি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে দলটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে আজ গুরুদায়িত্ব সেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল বিএনপি।

এই ইশতেহারের মূল স্লোগানই হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইশতেহারের ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে দলটি। ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে মোট ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ‘ইতিবাচক’ রাজনীতির বার্তা দিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া তিনি ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।

বিদেশি গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, “জনগণের সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানদেরও দেশে ফিরে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অধিকার রয়েছে। কে রাজনীতি করবে—সে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত জনগণই নেবে।” তার এমন বক্তব্যের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা প্রাণসঞ্চার হয়েছে। নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় দলটির অফিসের তালা খুলেছে, কোথাও কোথাও মিছিলও করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং জুলাই গণহত্যা ইস্যুতে দলটির বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপিকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। দলটির রাজনীতি উন্মুক্ত করার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের কাছে এ দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া হলো—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বনির্ভর ও উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে নিতে জাতীয় ঐক্যই হবে প্রধান শক্তি। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনই এখন মূল লক্ষ্য। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পথে এগিয়ে যাবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো আর কোনো দানব যেন এ দেশের জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, ১৮ কোটি মানুষের চাওয়া সেটাই।

দীর্ঘ বিশ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য রইল দেশের আপামর জনসাধারণের দোয়া, ভালোবাসা ও শুভকামনা। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আপন মহিমায় এগিয়ে যাক।

লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।