
সব ধরনের অনাচার ও অনিয়মের ‘সিন্ডিকেট’ ভেঙে দিতে তার সরকার বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘‘হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’’
বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর এটিই জাতির উদ্দেশে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ।
ভাষণে তিনি পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, এমপিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ এবং রাজধানীর ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনাসহ সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরেন।
রমজানে সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীদের প্রতি সতর্কবার্তা
আসন্ন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আপনাদের প্রতি আহ্বান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এ মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না।’’ তিনি সতর্ক করে বলেন, তার সরকার সব ক্ষেত্রে অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।
একইসঙ্গে রমজানে ইফতার, তারাবি ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে অপচয় রোধে অফিস-আদালত ও বাসা-বাড়িতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানান সরকারপ্রধান।
এমপিরা প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না
সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘‘বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না।’’ তিনি জানান, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সরকার মহানবীর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ করতে চায় এবং এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন।
সবার সমান অধিকার
তারেক রহমান স্পষ্ট করেন যে, এই সরকার কেবল বিএনপি সমর্থকদের নয়, বরং সব নাগরিকের। তিনি বলেন, ‘‘নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। দলমত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার।’’
মাদক-জুয়া নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোর-জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’’ এছাড়া সমাজে অস্থিরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
রাজধানীর চাপ কমাতে রেল যোগাযোগে গুরুত্ব
ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট ও জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন তারেক রহমান। তিনি জানান, মানুষ যাতে নিজ জেলায় থেকেই দাপ্তরিক ও ব্যবসায়িক কাজ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে।
ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘদিনের স্লোগান ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘আপনারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের।’’
