চবি উপাচার্যের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন, আলোচনায় ৬ শিক্ষক


১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী পরিচালিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) বর্তমান উপাচার্যের ‘সাময়িক’ নিয়োগের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নতুন উপাচার্য হিসেবে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের ছয়জন শিক্ষকের নাম আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি দেশে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে যোগ্য, গবেষণামুখী ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে এবং সরকারের উচ্চপর্যায়েও এ নিয়ে যোগ্য প্রার্থীর খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অ্যাক্টের ১২ (১) ধারা অনুযায়ী উপাচার্যের মেয়াদ চার বছর হওয়ার কথা। একই অ্যাক্টের ১২ (২) ধারা অনুযায়ী পদ শূন্য হলে চ্যান্সেলর সাময়িক সময়ের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারেন। তবে এই সাময়িক সময়ের কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ না থাকার সুযোগে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার গত দেড় বছর ধরে উপাচার্যের পদে বহাল রয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সাময়িকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের এই দায়িত্বে থাকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর চবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের আলোচনা নতুন করে গতি পেয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা এরই মধ্যে যোগ্য প্রার্থীর খোঁজ নেওয়া শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের পক্ষ থেকেও বর্তমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে এই নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়জন শিক্ষকের নাম এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে আলোচনায় থাকা এই ছয়জন শিক্ষক হলেন—চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম।

এছাড়াও চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. নছরুল কাদির, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান এবং চবি শাহ আমানত হলের প্রভোস্ট ও বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসানের নামও জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একজন গ্রহণযোগ্য উপাচার্য অত্যন্ত প্রয়োজন। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, বর্তমান উপাচার্য পদে অনেক আগে অবসরপ্রাপ্ত একজনকে দায়িত্ব দেওয়ায় তিনি জবাবদিহির মধ্যে ছিলেন না, যার ফলে দেড় বছর ধরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।

প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সুশাসনের বদলে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষার্থীদের নাভিশ্বাস উঠেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন আরও বলেন, বর্তমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনায় বিশ্বাসী এবং অভিজ্ঞ কাউকে নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজির সাবেক চেয়ারম্যান ও শাহ আমানত হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. চৌধুরী মনিরুল হাসান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা দিয়েছেন। যেখানে গবেষণাকেই তিনি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছেন। গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার বিকাশ সাধনকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমুন্নত রেখে বাস্তবমুখী শিক্ষা পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং নেতৃত্ব গঠনের কাঠামো গড়ে তুলতে হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য মানুষকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত শিক্ষকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের স্কলার রয়েছে। আমরা চাই তারাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলোর নেতৃত্বে আসুক।

গত দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম।

প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বদলে বর্তমান প্রশাসন কেবল নিয়োগ নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল, যেন এটি একটি চাকরির পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রধান উপদেষ্টা ও কয়েকজন উপদেষ্টা চট্টগ্রামের হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে কোনো উন্নয়ন করতে পারেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তাই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানান প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম।

বর্তমান উপাচার্যের মেয়াদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন। ছাত্রনেতা আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় জাতীয়তাবাদী আদর্শের যে শিক্ষক নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া সময়ের দাবি।

বর্তমান উপাচার্য অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি জবাবদিহির বাইরে আছেন উল্লেখ করে আলাউদ্দিন মহসিন আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারকে সাময়িক সময়ের জন্য নিয়োগ দিলেও দেড় বছরেও সেই মেয়াদ শেষ না হওয়াটা একটি বড় প্রশ্ন।