স্রষ্টার যে রহস্য বিজ্ঞান আজও বোঝেনি


আগে যারা আমার লেখা পড়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই কুয়োর ব্যাঙ আর মহাসাগরের ব্যাঙের সেই গল্পটি মনে আছে। আমাদের জীবনবোধ ও বিশ্বাসের জায়গাতেও ঠিক এমনি একটি সীমারেখা টানা যায়। ধর্মকে আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আর বিজ্ঞানকে আমরা প্রমাণের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে চাই। মূলত বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণার নামই বিজ্ঞান।

বিজ্ঞান মানুষকে নিত্যনতুন আবিষ্কার করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়—এটি কীভাবে হলো, কেন হলো, এর নেপথ্যে কী আছে? অষ্টাদশ শতকে শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে বিজ্ঞানের যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি শুরু হয়েছিল, তা আজ বহুদূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর মূল ভিত্তি আসলে কোথায়?

এই ভিত্তির সন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞান আজ শুধু পৃথিবী নয়, স্রষ্টার বিশাল মহাবিশ্ব নিয়েও নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা ‘ভয়েজার ১’ এবং ‘ভয়েজার ২’ মহাকাশযান আজ আমাদের সৌরজগৎ পার হয়ে বহুদূরে চলে গেছে। কিন্তু এই দূরত্ব আসলে কতটুকু?

আলোর গতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার। সেই হিসেবে ভয়েজার স্পেসক্রাফটগুলো এত বছরে মাত্র ‘ওয়ান লাইট ডে’ বা আলো একদিনে যতটুকু পথ অতিক্রম করে, ততটুকু দূরত্বই পেরোতে পেরেছে। ভয়েজার মহাকাশযানে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, সংগীত ও আমাদের অবস্থানের তথ্য যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী এর সন্ধান পেলে পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা পায়।

অন্যদিকে হাবল বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে আমরা প্রায়ই মুখরোচক খবর শুনি—হাজার কোটি আলোকবর্ষ দূরে হীরক বা সম্পদে ভরপুর কোনো গ্রহের সন্ধান মিলেছে। কিন্তু সেখানে কি আমাদের পক্ষে আদৌ পৌঁছানো সম্ভব? এই প্রশ্নটি থেকেই যায়।

মহাকাশের এই বিশালতার কথা বাদ দিয়ে এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি, যা আমাদের খুব কাছের। ধরুন, বুর্জ খলিফার মতো একটি সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা হলো। বিজ্ঞানীরা সেখানে তাদের মেধা দিয়েছেন, প্রকৌশলীরা নিখুঁত নকশা করেছেন, আর শ্রমিকরা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন। কিন্তু এই ভবন তৈরিতে ব্যবহৃত লোহা, তামা, দস্তা, বালি, পাথর বা সিমেন্টের মতো কাঁচামালগুলো কোথা থেকে এসেছে? এগুলো সবই খনি থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। মানুষ বা বিজ্ঞানীদের পক্ষে শূন্য থেকে একটি বালুকণাও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়; তারা কেবল প্রকৃতির দেওয়া সম্পদের রূপান্তর ঘটাতে পারেন।

আপনার গায়ের জামাটির কথাই ভাবুন। তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড় এবং সেই কাপড় কেটে দর্জি জামা তৈরি করেন। কোনো বিজ্ঞানের পক্ষেই কি কৃত্রিমভাবে একটি তুলার বীজ বা গাছ সৃষ্টি করা সম্ভব? এখানেও সেই প্রকৃতিরই একচ্ছত্র আধিপত্য।

প্রকৃতির এই আধিপত্য আর অপার রহস্যের কথা বলতে গেলে পৃথিবীতে এমন আরও অনেক কিছুই রয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের আজও ভাবিয়ে তোলে। সামুদ্রিক ইল মাছের শরীরে এত বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসে? সমুদ্রের এত বিশাল জলরাশি কেনই বা লবণাক্ত? বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের বুকেই বা কী রহস্য লুকিয়ে আছে? এসবের প্রকৃত উত্তর কেবল মহান সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। আমরা দৈনন্দিন জীবনে ভাত, মাছ, মাংস খেয়ে বেঁচে থাকি।

কিন্তু কখনো কি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছি, যে চালের ভাত আমরা খাচ্ছি, তা পৃথিবীর কোন জমিতে উৎপাদিত হয়েছে? বাজারে গিয়ে যে মাছ বা মাংস আমরা কিনি, তা কোন সাগরে বা মাঠে বেড়ে উঠেছে, তা কি নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব? ধর্মে বলা আছে, মানুষের জন্মের পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই তার রিজিক নির্ধারিত হয়ে যায়। আমরা আজ কয়টি ভাতের দানা খাব বা কোন অংশটি আমাদের আহার্য হবে, তা কেবল স্রষ্টাই জানেন।

অথচ স্রষ্টার দেওয়া এই রিজিক ও প্রকৃতির অপরিসীম দানকে ভুলে গিয়ে মানুষ আজ মেতে উঠেছে ধ্বংসের খেলায়। বিশ্বের ভয়ানক সব যুদ্ধবিমান (যেমন বি-২ বোম্বার) বা হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি হচ্ছে টাইটানিয়ামসহ প্রকৃতির বুক থেকে পাওয়া নানা ধাতু ও জ্বালানি দিয়ে। প্রকৃতির দেওয়া সম্পদ কাজে লাগিয়ে আজ আমরা একে অন্যকে হত্যা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছি।

অথচ পৃথিবীর কোনো ধর্মই মানুষ হত্যা, একে অপরকে কষ্ট দেওয়া বা আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলোকে সমর্থন করে না। কোরআন, গীতা, ত্রিপিটক বা বাইবেল—সব ধর্মগ্রন্থই একই লাইব্রেরির তাকে পাশাপাশি শান্তিতে সাজানো থাকে, তাদের মধ্যে কখনো ঝগড়া হয় না। যত সংঘাত আর বাড়াবাড়ি, সব কেবল আমাদের এই মানুষদের মাঝেই।

মানুষের এই সংঘাতময় স্বভাবের বিপরীতে মহাবিশ্বের সৃষ্টির দিকে তাকালে আমরা এক পরম শৃঙ্খলার দেখা পাই। বিজ্ঞানীদের অনেকের ধারণা, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। মহাকাশ বিষয়ক গবেষকদের মতে, কোনো বস্তু বা গ্যাসীয় পিণ্ড বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট তাপ ও চাপের প্রয়োজন হয়। সেই বিস্ফোরণের পর ক্ষুদ্র ও বৃহৎ টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ে মহাবিশ্বের রূপ নিয়েছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সেই আদি অণু বা গ্যাসীয় পিণ্ডটি কোথা থেকে এলো?

তাই এই কাল্পনিক ধারণার চেয়ে এই সত্যটিই অধিক যুক্তিসঙ্গত যে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায় মানুষের কল্যাণের জন্যই এই নিখুঁত মহাবিশ্বকে ডিজাইন করে সৃষ্টি করেছেন। তাই আসুন, সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে স্রষ্টার দেওয়া এই প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখি। মহাবিশ্বের এই নীল গ্রহটাকে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য স্থান হিসেবে গড়ে তুলি।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।