
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বর্গা নেওয়া লবণের মাঠে কাজ করার সময় মোহাম্মদ হোছাইন নামের এক চাষিকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম এবং লবণ লুটের ঘটনার পাঁচ দিন পর উল্টো ওই ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই পাল্টা মামলাটি করেছেন আগের মামলার অন্যতম আসামি মিজানুর রহমান। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদ সাইফুল্লাহকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় লবণ চাষিকে কুপিয়ে জখম এবং ৩০০ মণ লবণ লুটের ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় গুরুতর আহত লবণ চাষি মোহাম্মদ হোছাইন চরপাড়া এলাকার জেবর মুল্লুকের ছেলে। বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে ছেলে মো. দিদার হোসাইনও সেদিন আঘাতপ্রাপ্ত হন। এই ঘটনায় একই দিন রাতে বাঁশখালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন ভুক্তভোগীর ছেলে মো. দিদার হোসাইন।
মো. দিদার হোসাইনের দায়ের করা এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ছয়টার দিকে মোহাম্মদ হোছাইন তার বর্গা নেওয়া লবণের মাঠে কাজ করতে যান। এ সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে দা, কিরিচ ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীদের এলোপাতাড়ি আঘাতে মোহাম্মদ হোছাইনের মাথা, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া এলাকার মৃত কবির আহমদের ছেলে আব্দুল কাদের, মো. আজম প্রকাশ জমির এবং মো. মিজানুর রহমানকে সুনির্দিষ্ট আসামি করা হয়। এজাহারে মো. দিদার হোসাইন আরও উল্লেখ করেন, হামলার সময় অভিযুক্তদের সঙ্গে কলিম উল্লাহ ও নাছিরসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন এবং তারা বিক্রির জন্য মাঠে মজুত রাখা প্রায় ৩০০ মণ লবণ লুট করে নিয়ে যান।
এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদ সাইফুল্লাহ জানান, লবণ মাঠে হামলা ও লুটের ঘটনায় থানায় মামলা রুজু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পাঁচ দিন পর বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লবণ মাঠে হামলা, লবণ লুট, চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে উল্টো ওই লবণ চাষি ও তার ছেলেসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মো. দিদার হোসাইনের মামলার তিন নম্বর আসামি মিজানুর রহমান।
মিজানুর রহমানের মামলায় অভিযুক্তরা হলেন—ছনুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজুর রহমানপাড়ার মৃত নবী হোসেনের ছেলে আব্বাস উদ্দিন, জেবর মুল্লুকের ছেলে মোহাম্মদ হোছাইন এবং তার ছেলে আক্তার হোসাইন, মৃত জামাল উদ্দিনের ছেলে রবি আলম এবং মৃত নুর আহমদের ছেলে সালাউদ্দিন। তাদের সবার বাড়ি ছনুয়া ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায়। জানা যায়, গত রোববার বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেন এই পাল্টা মামলার বাদী মিজানুর রহমান।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ হোছাইনকে মারধরের পর উল্টো কেন তার বিরুদ্ধে মামলা করা হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে পাল্টা মামলার বাদী মিজানুর রহমান বলেন, যেহেতু তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে, তাই তারাও বসে না থেকে পাল্টা মামলা করেছেন। মিজানুর রহমান নিজে আঘাতপ্রাপ্ত বা ভুক্তভোগী না হওয়ার পরও কেন মামলা করলেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে লবণ চাষিকে মারধরের পর উল্টো মামলা দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মিজানুর রহমানের দায়ের করা মামলার বিবাদী আব্বাস উদ্দিন জানান, তার কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে লবণ চাষ করেন মোহাম্মদ হোছাইন। হামলার শিকার হওয়ার পর আব্বাস উদ্দিন ও মোহাম্মদ হোছাইনের ছেলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং প্রথম মামলায় আব্বাস উদ্দিন সাক্ষী হয়েছেন।
আব্বাস উদ্দিন দাবি করেন, শুধু সাক্ষী হওয়ার কারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে এই পাল্টা মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং মিজানুর রহমানের সঙ্গে তাদের কোনো পূর্বশত্রুতা নেই।
মামলার অপর দুই বিবাদী সালাউদ্দিন ও রবি আলম জানান, মোহাম্মদ হোছাইনের ওপর হামলার পর ঘটনাস্থলে তদন্ত করতে এসেছিলেন বাঁশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বিভাস চন্দ্র সাহা। ওই সময় এসআই বিভাস চন্দ্র সাহা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সালাউদ্দিন ও রবি আলমের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা পুলিশকে সত্য সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মূলত পুলিশকে সত্য তথ্য জানানোর কারণেই মিজানুর রহমান আক্রোশবশত তাদেরও আসামি করেছেন বলে সালাউদ্দিন ও রবি আলম অভিযোগ করেন।
