পটিয়াসহ ১৩ এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড: এসি ও গাড়ি থাকলে মিলবে না সুবিধা


সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী কিংবা এসি ও গাড়ির মতো বিলাসবহুল সম্পদের মালিকদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পরিবার কার্ড নীতিমালা। নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মধ্যে ছয় শ্রেণির মানুষকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। আগামী ১০ মার্চ এই কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ নামে এই নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। খুব শিগগিরই এটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে। নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে, পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী হলে, বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মালিক বা বড় ব্যবসা থাকলেও এই কার্ড পাওয়া যাবে না। কর্মসূচির মূল দর্শন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।

বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আলোকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই নীতিমালা তৈরি করেছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। ওই দিন একযোগে ১৪টি উপজেলায় কর্মসূচির সূচনা করা হবে। মন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন আশা প্রকাশ করেন, এই পাইলট কর্মসূচি আগামী চার মাসের মধ্যে শেষ হবে এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা এর আওতায় আসবে।

নীতিমালায় কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তালিকায় সাত শ্রেণির মানুষকে রাখা হয়েছে। ভূমিহীন ও গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যের পরিবার, হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতো অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং শূন্য দশমিক ৫ একর বা এর কম জমির মালিকরা এই কার্ড পাবেন।

প্রাথমিকভাবে ১৪টি উপজেলার প্রত্যেকটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীরা এই কার্ডের আওতায় ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবেন। প্রথমে দেশের ৬ হাজার ৫০০ দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে ২ কোটি দরিদ্র পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে। সরকার নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই ভাতা সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারী প্রধান’ সদস্যের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া এই কর্মসূচি চালু হলে সব নগদ ভাতা ও টিসিবির সহায়তা এক কার্ডের অধীনে চলে আসবে।

এই কর্মসূচির বিষয়ে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, চলতি বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ করে এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, টাকা ছাপিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। মাহবুব আহমেদ আরও মত দেন, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী যেসব পরিবারের ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, তাদেরও অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ডের অর্থায়ন নিয়ে অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরের বাজেটের অপ্রত্যাশিত খাত এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে অর্থ দেওয়া হবে। অপ্রত্যাশিত খাতে চার হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থাকায় অর্থায়ন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

দেশে বর্তমানে ৯৫টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলমান থাকলেও সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকৃত দরিদ্রদের ২২-২৫ শতাংশ বাদ পড়ছেন। এই সমস্যা দূর করে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়াই প্রকল্পের লক্ষ্য। বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে স্থানান্তর করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাও পাওয়া যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

পাইলট প্রকল্পের জন্য ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি, চট্টগ্রামের পটিয়া, বান্দরবানের লামা, সুনামগঞ্জের দিরাই এবং ঠাকুরগাঁও সদরের মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চলসহ মোট ১৩টি এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পাইলটিংয়ের জন্য মোট ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যার ৭৭ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্রদের হাতে পৌঁছাবে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে খানা জরিপ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজ এবং এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।