
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের পরিদর্শনের সময়কার অনিয়ম ও রোগীদের দুর্ভোগের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিককে ব্লেড মারার হুমকি দেওয়া আইনজীবী অহিদুল ইসলাম চৌধুরীর অতীত ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এক যুগের পুরোনো মাদক মামলায় জেল খাটা, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার হওয়ার অভিযোগ এবং ভাইয়ের সন্ত্রাস মামলায় গ্রেপ্তারের খবর তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এর আগে, আনোয়ারা হাসপাতালের কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দীন চৌধুরীর অসহায়ত্ব এবং মো. আলমগীর, মোহাম্মদ হোসেন ও জগদীশ দে-সহ রোগীদের ভোগান্তির সংবাদ প্রকাশের জেরে একুশে পত্রিকার জিন্নাত আয়ুবকে ফোন করে সিপ্লাস-এর মোহাম্মদ রেজাউল করিম সাজ্জাদকেও ব্লেড দিয়ে পোঁচানোর হুমকি দেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির এই সদস্য।
তবে অহিদুল ইসলাম চৌধুরীর এমন হুমকির বিষয়টি একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকে জানানো হলে তিনি এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সাংবাদিকদের সহযোগিতা চান।
মাদক মামলায় জেল খাটার ইতিহাস
অহিদুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিক ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজের কাছে একটি পুরোনো মাদক মামলার অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, অনুসন্ধানে সেই ঘটনার সত্যতা মিলেছে।
জানা যায়, প্রায় এক যুগ আগে আনোয়ারার পারকি চর এলাকায় মদসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। ওই মামলায় তাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। মদসহ গ্রেপ্তার হওয়া ওই মামলার এক নম্বর আসামি ছিলেন আইনজীবী অহিদুল ইসলাম চৌধুরী, দুই নম্বর আসামি ছিলেন কামাল উদ্দীন এবং তিন নম্বর আসামি ছিলেন আনোয়ার হোসেন।
ওই মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন যে, মদসহ ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে অহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও কামাল উদ্দীন দুজনেই জেল খেটেছেন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার ও বৈপরীত্য
সাংবাদিক সবুজের সাথে কথোপকথনে অহিদুল ইসলাম চৌধুরী নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ায় অহিদুল ইসলাম চৌধুরীকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক সাবেক নেতা অভিযোগ করে জানান।
অন্যদিকে, তাঁর নিজের ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী একজন আওয়ামী লীগকর্মী হিসেবে পরিচিত এবং প্রায় দুই মাস আগে চট্টগ্রামের চকবাজার থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। নিজের ভাইয়ের আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ এবং সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজে ও তার অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যদের ‘রাজনৈতিক ট্যাগ’ দিয়ে বিষোদ্গার করছেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল
নিজের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বারবার তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। একুশে পত্রিকার প্রতিবেদক আবছার রাফি তাকে সাংবাদিক জিন্নাত আয়ুবকে ফোন করে দেওয়া হুমকির বিষয়ে প্রশ্ন করলে, তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রতিবেদককে জেরা করতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটে দেন। একইভাবে, সাংবাদিক সবুজ মাদক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি চরম অসহিষ্ণু আচরণ করেন এবং সাংবাদিককে পাল্টা আক্রমণ করে কথা বলেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের এমন ভয়াবহ হুমকি দেওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এএসএম বজলুর রশিদ মিন্টু একুশে পত্রিকাকে বলেন, একজন সাংবাদিক তো সাংবাদিকতা করবেন এবং তাঁর সংবাদ প্রচার করবেন, এখানে কাউকে হুমকি-ধমকি দেওয়া কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অহিদুল ইসলাম চৌধুরী যা করেছেন, তা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আচরণ এবং এর দায় আইনজীবী সমিতি নেবে না।
তিনি আরও জানান, অহিদুল ইসলাম ব্যক্তি হিসেবে একজন আইনজীবী হলেও তো তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন, তাকে আইন মেনেই কাজ করতে হবে। ব্লেড মারার হুমকির মতো বেআইনি কোনো কার্যক্রমকে কেউ সমর্থন করবে না।
এএসএম বজলুর রশিদ মিন্টু আরও যুক্ত করেন, ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা যদি সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন, তবে তারা প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
