জুলাই অভ্যুত্থান: ১ হাজার ৮৪১টি মামলার মধ্যে চার্জশিট মাত্র ১৪০টির


২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া বেশিরভাগ মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। সারাদেশে ১ হাজার ৮৪১টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৭০১টিই তদন্তাধীন। এ সময়ে মাত্র ১৪০টি মামলার অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। আর রায় হয়েছে তিনটি মামলার। অর্থাৎ, মোট মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশেরই তদন্ত চলছে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডে ঢালাও মামলায় শুধু আওয়ামী লীগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নন, আসামি করা হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। এক ঘটনায় একাধিক মামলাও হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৪৫টি। গণহারে হওয়া এসব মামলা নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফৌজদারি আদালতে হওয়া জুলাই হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলারই বিচার এখনও শেষ বা শেষ পর্যায়ে আসেনি। যে তিনটি মামলার রায় হয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের।

পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রেকর্ড হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দেওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরি; যাতে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়। যেসব মামলায় হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে, সেগুলোর তদন্তে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলায় এত মানুষকে আসামি করায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে প্রমাণ না পাওয়া মামলাগুলো রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে ভবিষ্যতে প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৮৪১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি হাজার হাজার মানুষ। প্রায় প্রতিটিতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসামি। হত্যাসহ অন্যান্য মামলায় পুলিশের ৯৫২ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগে ৭৯১টি এবং অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫০টি মামলা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৪০টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৪৬টি হত্যা ও ৯৪টি অন্যান্য মামলা। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সর্বপ্রথম জুলাই হত্যাকাণ্ড মামলার চার্জশিট দেয়।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে হতাহতের ঘটনায় ৭৫৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৬৮টি এবং অন্যান্য মামলা ২৯০টি। ডিএমপি ৩৩৪টি হত্যা এবং ২৬৫টি অন্যান্য ধারার মামলা তদন্ত করছে। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তাসহ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৮৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ ২৩ পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। ডিএমপির ১৬৯টি মামলা তদন্ত করছে পিবিআই, ডিবি, সিআইডি, এটিইউ ও র‍্যাব।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতা, গুলি ও হামলার ঘটনায় হওয়া হত্যা মামলাগুলো মূলত রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু, সংঘর্ষে আটকা পড়া বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগে করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, কল রেকর্ড, ফরেনসিক পরীক্ষা ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, হত্যা মামলার অভিযোগ দাখিল হয়েছে ২৪টি এবং বিচার চলছে ২১টির। ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত তিনটি মামলার রায় হয়েছে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ২৬ জন এবং একজন ক্ষমাপ্রার্থী। বিচারাধীন মামলায় মোট আসামি ৪৫৭ জন। গ্রেপ্তার ১৬১, পলাতক ২৯৩ এবং জামিন, মৃত্যু ও খালাস পেয়েছেন একজন করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিসহ অন্যান্য ৭৪, পুলিশ ৬৫, সেনাবাহিনী ২০ ও আনসার বাহিনীর একজন রয়েছেন।

জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ খুন ও গুমে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা পলাতক সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে (১৭৫টি)। এছাড়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ১৫৯টি, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হকের বিরুদ্ধে ২৪টি, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে ১২৯টি মামলা রয়েছে। শীর্ষ দুই সাবেক আইজিপি কারাগারে থাকলেও বাকিরা পলাতক।

গ্রেপ্তারের পর এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের ২১ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পলাতক রয়েছেন মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকারসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।

ডিএমপির বাড্ডা থানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাড্ডা থানায় রেকর্ড হওয়া ১৮টি ছাড়া বাকি মামলা ডিবি, এটিইউ ও পিবিআই তদন্ত করছে। প্রাথমিক তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩/এ ধারায় তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, ঢালাও মামলার কারণে অনেক নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দুবাইপ্রবাসী সাহাদাত হোসেন, নরওয়ের দ্বৈত নাগরিক নুরুল ইসলাম শেখ এবং ব্যবসায়ী ফারুক হোসেনের মতো অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার আসামি হয়েছেন। অনেক বাদী জানান, তারা মূল আসামিদের ছাড়া কাউকেই চেনেন না।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্টের পর ব্যক্তিগত সুবিধা চরিতার্থ করতে কিছু নিরীহ লোককে আসামি করা হয়েছে। সরকার এগুলো যাচাই-বাছাই করে সঠিক তথ্য বের করবে। কেউ যেন অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, তারা সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চান এবং নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয় তার নিশ্চয়তা চান। তবে কিছু অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়ার খবরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল মামলা বাণিজ্য করেছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর এবং রেঞ্জ ও মহানগর পুলিশ কমিশনারের অফিসে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। তবে দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষী হাজির করা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, বিচারকাজ গতিশীল করতে তদন্তাধীন মামলাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে এসবের দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।