
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণের পর গুম ও হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইসমাইলুর রহমানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহ এ আদেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদীপক্ষের আইনজীবী ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. মিসবাহ উদ্দিন সাদেক জানান, দীর্ঘ শুনানির পর আদালত আসামি ইসমাইলুর রহমানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইসমাইলুর রহমানের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আনোয়ারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবুল বাশার।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া ইসমাইলুর রহমান নিখোঁজ আমান উল্লাহ আনুর সৎ শ্যালক। গোলাম রহমানের পালিত মেয়ে আইমুন নেছা প্রকাশ পাখিকে বিয়ে করেন আমান উল্লাহ আনু। ইসমাইলুর রহমানের পিতা গোলাম রহমানের মৃত্যুর পর জমিজমা নিয়ে ইসমাইলুর রহমান ও আমান উল্লাহ আনুর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সকালে তাঁরা দুজন চট্টগ্রাম শহরে যান এবং ইসমাইলুর রহমানের সৎমাতা জান্নাতুল ফেরদৌসের মুরাদপুরস্থ বাসায় দুপুরে খাওয়াদাওয়া করেন।
পরবর্তীতে আমান উল্লাহ আনুর বড় বোন ও মামলার বাদী মমতাজ বেগম ভাইয়ের মোবাইলে ফোন করলে আমান উল্লাহ আনু জানান, তিনি বাড়িতে আসার জন্য গাড়িতে উঠবেন। এরপর তাঁর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়ায় ইসমাইলুর রহমানের নম্বরে ফোন করেন মমতাজ বেগম। তখন ইসমাইলুর রহমান জানান, তিনি দুলাভাইকে গাড়িতে তুলে দিয়েছেন এবং চাতরী চৌমুহনীতে যানজটে আছেন। সেদিন থেকে আমান উল্লাহ আনু আর ঘরে ফেরেননি। এরপর আসামি ইসমাইলুর রহমান আত্মগোপনে থেকে বিদেশে চলে যান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আবুল বাশার জানান, আসামিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিহত আমান উল্লাহ আনুর শ্যালক ইসমাইলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে পালিয়ে ছিলেন এবং আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে যাতায়াত করতেন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই ইসমাইলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ইসমাইলুর রহমান ছনুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আমিরপাড়ার মৃত গোলাম রহমানের ছেলে।
আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণ ও গুম করার পর মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি ইসমাইলুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ে পাড়ি জমান। মামলাটি আনোয়ারা থানায় দায়ের করা হয়েছিল বিধায় আসামির যাতায়াত ঠেকাতে বাদী মমতাজ বেগম ইমিগ্রেশন পুলিশ বরাবর একটি লিখিত চিঠি দিয়েছিলেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, আমান উল্লাহ আনুকে হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনায় ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদ এবং তাঁর ছোট ভাই ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবিরসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মমতাজ বেগম। গত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি করা হয়। আদালত তা আমলে নিয়ে আনোয়ারা থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন প্যানেল চেয়ারম্যান আরফাতুল ইসলাম এমরান, পুতু চৌধুরী, ইউনিয়ন মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আবদুল আজিজ টিপু, আবদুল মোমেন, আবদু সাত্তার, মো. হেলাল উদ্দিন এবং রোজিনা আক্তার। এজাহারে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন, আসামিরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সদস্য।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশখালী ফেরার পথে আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি আনোয়ারা থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হলেও টাকা দেওয়ার পর আমান উল্লাহ আনুকে ছাড়া হয়নি। ৩ মার্চ তাঁকে ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অভিযোগ রয়েছে, সেখানে এম. হারুনুর রশীদের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৯ সালের ৪ মার্চ চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির কাছে অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার না পেয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন মমতাজ বেগম। তখন আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিলেও আসামিদের ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে বাদী মমতাজ বেগম তদবির করতে ব্যর্থ হন, ফলে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। মমতাজ বেগম জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের পতনের পর গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তিনি ভাইয়ের হত্যার বিচারের আশায় দীর্ঘ সময় পর পুনরায় মামলাটি দায়ের করেছেন।
