
‘ভুল আছে বলে মানুষের ধারা, দোষ আছে বলে আদালত, অন্ধকার আছে বলে আলোর ঝলকানি, আর ক্ষমা আছে বলে মানুষ মহৎ।’ কথাগুলো মনে হয় কোনো এক কবি তাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে লিখেছিলেন। কিন্তু আজ চারপাশের দিকে তাকালে পৃথিবী শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণই চোখে পড়ে না। মনে হয়, দিন দিন চারদিকে অস্থিরতা, সংঘাত আর বিষাক্ত বাতাস যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই সংঘাত কখনো ব্যক্তিত্বের, কখনোবা স্বার্থের। কারণ যা-ই হোক না কেন, আমাদের অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির মুখে।
আমরা যদি ভেবে থাকি মহাবিশ্বের এই নীল গ্রহটি স্রষ্টা কেবল মানুষের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, তবে তা আমাদের একান্তই ভুল ধারণা। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও আমরা ভুলে যাই যে, এই পৃথিবীতে আমরা ছাড়াও আরও অসংখ্য জীবজন্তু, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও গাছপালার বাস। গহিন বনে কিংবা সাগরের অতল তলদেশে কত বিচিত্র প্রাণী যে বাস করে, তা কেবল স্রষ্টাই ভালো জানেন। অথচ আজ আমরা মানুষেরা যেন দানবে পরিণত হয়েছি। কথায় কথায় দ্বন্দ্ব, ভুল-বোঝাবুঝি আর যুদ্ধ—সব মিলিয়ে আমরা পৃথিবীর কোন প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, তা হয়তো আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না। মনের ভেতর শুধু একটি প্রশ্নই জাগে—কেন এমন হচ্ছে?
আন্তরিকতার আবরণে আজ কেবলই ছলনার গন্ধ। সত্য আর মিথ্যার এক ভয়ংকর খেলায় মেতেছি আমরা, যেখানে মিথ্যাকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর চেষ্টা চলছে। এই অহংবোধ আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব যখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রূপ নেয়, তখন তা জন্ম দেয় ভয়ংকর পরিস্থিতির। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামতে না থামতেই ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ও হুতি বিদ্রোহীদের সংঘাত বিশ্বকে অশান্ত করে তুলেছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে পরাশক্তির মধ্যকার উত্তেজনা আজ বিশ্বকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। ইরাক, ইরান, লিবিয়া, সিরিয়া থেকে শুরু করে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আজ কেবলই বারুদের গন্ধ।
ক্ষমতা আছে বলেই কি যা খুশি তাই করার অধিকার মানুষের আছে? স্রষ্টা তো আমাদের এই অনুমোদন দেননি। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের ভুলের কারণে আজ গোটা বিশ্বের মানুষকে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হচ্ছে, অকালে ঝরে যাচ্ছে নিষ্পাপ প্রাণ। এই শিশুদের কী দোষ? তারা তো যুদ্ধ কী, তা-ও জানে না। অথচ আজ আধুনিক মারণাস্ত্র, হাইপারসনিক মিসাইল আর বোমার আঘাতে ধ্বংস হচ্ছে জনপদ, ঘরবাড়ি। বোমার আঘাতে শুধু মানুষ নয়, প্রাণ হারাচ্ছে অবলা পশুপাখি আর কীটপতঙ্গ। সাগরের নিচে সাবমেরিনের মহড়া আর প্রযুক্তির আঘাতে বিপন্ন হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী। পৃথিবী তো কেবল আমার বা আপনার একার নয়!
এই ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে অচিরেই পুরো বিশ্ব ভয়ংকর খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়বে। বিঘ্নিত হবে খাদ্যশৃঙ্খল। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে তলিয়ে যাবে আবাদি জমি ও উপকূলীয় অঞ্চল। স্রষ্টা যেভাবে আমাদের চলতে বলেছেন, আমরা সেভাবে চলছি না বলেই প্রকৃতি আজ আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা আর মহামারির মতো দুর্যোগ বারবার আমাদের সতর্ক করছে। আমরা ভুলে যাই, স্রষ্টা ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। ২০২০ সালের করোনা মহামারি কিংবা মরুভূমির বুকে ভয়াবহ বন্যা তারই প্রমাণ।
চারদিকে আজ লাশের স্তূপ, সাইরেনের শব্দ, মুহুর্মুহু বোমা আর মিসাইলের প্রচণ্ড আওয়াজ। আকাশে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া আর তার নিচেই নিষ্পাপ শিশুদের আর্তনাদ। স্বজনহারা মানুষগুলো নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে। লাভ-ক্ষতির হিসাব না বোঝা এই মানুষগুলোর মনে হয়তো একটাই আক্ষেপ জাগে—এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়াটাই যেন তাদের পাপ! যে বিজ্ঞান আমাদের শিক্ষার আলো, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন দিয়ে পৃথিবীকে এতটা এগিয়ে নিয়েছে, আজ সেই বিজ্ঞানেরই অপব্যবহার আমাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আসুন, আমরা প্রকৃতিকে তার নিজের মতো চলতে দিই। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে সৃষ্টির সব প্রাণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি। সব অহংকার ও দ্বন্দ্ব ভুলে স্রষ্টার দেওয়া এই সুন্দর নীল গ্রহটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি। আগামী প্রজন্মের জন্য, প্রতিটি শিশুর জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
উৎসর্গ: বর্ণ ও ধর্ম-নির্বিশেষে এই পৃথিবীর সকল নিষ্পাপ শিশুর প্রতি।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।
