
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বনাম ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। তেহরানসহ ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানও বসে নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে তেহরান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পেন্টাগন ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই যুদ্ধ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে ধরে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ফ্লোরিডার সদর দপ্তরে অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই সংকট কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
টানা হামলায় ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলায় ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮০ জন শিশু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, ৩ হাজার ৬৪৩টির বেশি বেসামরিক স্থাপনা এবং অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে। রাজধানী তেহরানের অনেক বহুতল ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় আতঙ্কিত বাসিন্দারা শহর ছাড়ছেন, ফলে সেখানকার ব্যস্ত রাস্তাঘাট এখন অনেকটাই জনশূন্য।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনায় ১৯ দফায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সেনাসদস্য এবং ইসরায়েলের ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি পারস্য উপসাগর ও ইরাক উপকূলে মার্কিন এবং বাহামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে ইসরায়েল লেবাননে স্থল ও আকাশপথে হামলা জোরদার করেছে, যেখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবিরে হামাস নেতা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল আলী নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর জবাবে হিজবুল্লাহও রকেট ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।
এই সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শিয়া-অধ্যুষিত আজারবাইজানে ড্রোন হামলার পর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো—ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস তাদের মিত্রদের সুরক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও নৌবাহিনী পাঠাচ্ছে। জর্জিটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ানের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল গাদ্দাফি বা সাদ্দামের আমলের মতো শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলেই ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু তেমন কিছু না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি অবিশ্বাস্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে বলেছে, তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আরব দেশগুলোকে এই যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার দাবি করে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় খোদ মার্কিন রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য এই যুদ্ধ একটি বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে ট্রাম্পের মিত্র ও উপদেষ্টারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
