চকরিয়ায় বালুদস্যুদের রাজত্ব: ক্ষতবিক্ষত কৃষিজমি, ভাঙন আতঙ্ক, নির্বিকার প্রশাসন?


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাং ইছাছড়ি এলাকায় ছড়াখালের তীর ও ফসলি জমি থেকে মাটি কাটায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দিনরাত একাধিক শ্যালো মেশিনের গর্জনে কাঁপছে গ্রাম। আর ফসলি জমি ভাঙনের আতঙ্কে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উত্তর হারবাং ইছাছড়ি ছড়াখালের দুই তীর ঘেঁষে থাকা কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি এবং জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলো এখন চরম হুমকির মুখে। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ফসলি জমি, মসজিদ-মাদরাসা, সড়ক, সেতু ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী বালু লুটেরা নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র পাহারায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করে আসছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলায় খালের পাড় ভেঙে পড়ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক ধসে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ভাই শাহাব উদ্দিন সশস্ত্র পাহারা দেন বলে এলাকাবাসী দাবি করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়।

একাধিক বাসিন্দা জানান, সারারাত ট্রাক চলাচল আর শ্যালো মেশিনের শব্দে ঘুমানো যায় না। বাতাসে উড়তে থাকা বালুর ধুলোয় শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে উত্তর হারবাং ইছাছড়ি এলাকার ছড়াখাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ছবি তুলতে গিয়ে নাজিম উদ্দিন ও তাঁর সহযোগীদের হাতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন চকরিয়ার তিন সাংবাদিক। তাঁরা হলেন কালের কণ্ঠের চকরিয়া প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ, আমার দেশ পত্রিকার ইকবাল ফারুক এবং একুশে পত্রিকার এম. জিয়াবুল হক।

হামলার শিকার সাংবাদিকেরা জানান, তাঁরা সরেজমিনে বালু উত্তোলনের ভিডিও ও ছবি ধারণ করছিলেন। এ সময় শ্রমিকেরা চিৎকার শুরু করলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন নাজিম উদ্দিন। তিনি সাংবাদিকদের ‘মাটিতে পুঁতে ফেলতে’ নির্দেশ দেন। এরপর তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ছড়ার পানিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। ছোটন কান্তি নাথ ও এম. জিয়াবুল হককে মারতে মারতে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এতে ছোটন কান্তি নাথের মাথা ফেটে যায় এবং এম. জিয়াবুল হকের ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। অন্যদিকে ধারালো অস্ত্রের কোপে ইকবাল ফারুকের ডান হাতের তালু কেটে যায়।

এই ঘটনায় নাজিম উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চকরিয়া থানায় মামলা হয়েছে। তবে এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।

পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে খাল ও নদী থেকে বালু উত্তোলন করলে ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়ে। হারবাংয়ের ডেপার ছড়াখালের বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই স্পষ্ট করছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নাজিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। সাংবাদিকদের মারধরের পর বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন জানান, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বালু উত্তোলন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে পুলিশ সহযোগিতা করবে।

চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুপায়ন দেব বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী যেই হোক না কেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দুর্বৃত্তরা ইছাছড়ি গ্রামে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বালুমহালের ইজারাদার তাঁর নির্ধারিত এলাকার বাইরেও বালু উত্তোলন করেছেন। শর্ত অনুযায়ী শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা যায় না। সেখানে বেশ কয়েকটি শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি আরও জানান, বালু উত্তোলনকারীদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ইজারাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আগামীতে যাতে এই মহাল আর ইজারা না দেওয়া হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।