সুখ কোথায়? মরীচিকার সন্ধানে আমরা…


কবি জয় গোস্বামীর সেই বিখ্যাত লাইন দুটি দিয়ে শুরু করা যাক—
“আমরা তো অল্পে খুশি! কী হবে দুঃখ করে?
আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাত-কাপড়ে!”

বিখ্যাত লেখক ও মহাকাশবিজ্ঞানী আমিনুল হকের একটি আলোচনা থেকে চমৎকার একটি বিষয় অনুধাবন করা যায়—সুখে থাকলে নাকি মানুষকে ভূতে কিলায়! কিন্তু কেন? সুখে থাকলে তো শান্তিতে থাকার কথা!

ইতিহাসের পাতা থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন গ্রিসের এক দার্শনিক ছিলেন, নাম ডায়োজিনিস। তিনি বাজারের এক কোণে একটি পিপার (ব্যারেল) ভেতর থাকতেন। একটি বাটি সম্বল করে মানুষের কাছে চেয়ে যা পেতেন, তাতেই তাঁর দিন চলে যেত। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচণ্ড জ্ঞানী, তাই মানুষ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজতে তাঁর কাছে আসত।

একদিন মহাবীর আলেকজান্ডার তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। কথায় কথায় আলেকজান্ডার বললেন, “আমি এবার ভারতবর্ষ জয় করতে চাই!” বৃদ্ধ দার্শনিক ডায়োজিনিস হাসলেন। বললেন, “তোমার তো সব আছে, তুমি তো সুখে আছ। এখন শান্তিতে ঘুমাবে আর খাবে, তা না করে এত কিছু কেন চাও?” আলেকজান্ডারের উত্তর ছিল, “যতদিন না পুরো ভারতবর্ষ দখল করতে পারব, ততদিন আমার মনে শান্তি নেই। সব জয়ের পর আমি গ্রিসে ফিরে শান্তিতে বিশ্রাম নেব।”

আলেকজান্ডারের গৃহশিক্ষক ছিলেন অ্যারিস্টটল। তিনিও তাঁকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আলেকজান্ডার রওনা হলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুর্গম ও ভয়ংকর হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে ভারতে পৌঁছানোর পর তাঁকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। মশার কামড়, ম্যালেরিয়া এবং দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েন। অবশেষে তিনি সৈন্যদের দেশে ফেরার নির্দেশ দেন, কিন্তু গ্রিসে ফিরে সেই পরম শান্তির ঘুম আর তাঁর ঘুমানো হয়নি। পথিমধ্যেই এই মহাবীরের মৃত্যু হয়। সেই যে দার্শনিক বলেছিলেন—সুখে থাকলে মানুষকে ভূতে কিলায়, তা যেন আলেকজান্ডারের জীবনেই অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল!

এই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। স্রষ্টা আমাদের যতটুকু দিয়েছেন, ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী করছি? সুখের আশায় আমরা পরিবার-পরিজন ছেড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছি। কিন্তু সেখানে কি আসলেই সুখ আছে? হাড়ভাঙা পরিশ্রম না করলে কেউ এক মুঠো ভাতও দেয় না।

আমাদের মনের ভেতর সারাক্ষণ হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমার এটা হচ্ছে না কেন? ও আমার চেয়ে এগিয়ে গেল কেন? ওর এত কিছু আছে, আমার নেই কেন? অথচ আমরা যদি একটু চারপাশে তাকাই, তবে দেখব যারা ‘দিনে আনে দিনে খায়’, তারাই প্রকৃত সুখী। তাদের উঁচু দালান বা বিলাসবহুল গাড়ির স্বপ্ন নেই। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতে তারা নিশ্চিন্তে ঘুমায়। লালন সাঁইজি এককথায় চমৎকার বলেছিলেন, “যাঁর যত তলা, তাঁর তত জ্বালা!” অর্থাৎ, যাঁর যত সম্পদ, তাঁর তত বেশি দুশ্চিন্তা। সম্পদশালীরা সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন—বাড়িটা ঠিক আছে তো? গাড়িটা ঠিকমতো চলছে তো? সামনে আরও দুটো ফ্ল্যাট কেনা যাবে তো? তারা একবারও ভাবেন না যে, সমাজে এমন অনেক হতদরিদ্র মানুষ আছেন, যারা অন্যের বাসায় কাজ করে বা কোনোমতে দুবেলা খেয়ে বাঁচতে পারলেই নিজেদের চরম সৌভাগ্যবান মনে করেন।

অন্যদিকে, পৃথিবীর শীর্ষ ধনীরা একেকটি সাম্রাজ্য দখলের পরও এখন অন্য গ্রহে, যেমন মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু সেখানে কি আসলেই সুখ মিলবে? সেখানে কি কেউ এক রাত শান্তিতে কাটাতে পেরেছে? মানুষ আজ একে অপরকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। কে কার চেয়ে কত বেশি অর্জন করবে, কার কাছ থেকে কী কেড়ে নেবে—সেই প্রতিযোগিতায় সবাই মত্ত। নিজের সামান্য লাভের জন্য মানুষ অন্যের জীবন ধ্বংস করতেও পিছপা হচ্ছে না। আর এর ফলশ্রুতিতেই চারদিকে হানাহানি, মারামারি আর সংঘাত বাড়ছে।

আমরা অনেকেই মনে করি, গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষ বেশি সুখী। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শহরের মানুষ গ্রামের সেই নির্মল আলো-বাতাস, সবুজ ধানের খেত, কৃষকের অমলিন হাসি, জোছনা রাতের রূপ কিংবা জোনাকির আলো থেকে বঞ্চিত। তারা মূলত এক ধরনের বন্দি জীবন যাপন করে। দিনের বেলায়ও তাদের ফ্ল্যাটের শক্ত দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখতে হয়। সারাক্ষণ এক অজানা আতঙ্কে ভোগে তারা—এই বুঝি চোর বা ডাকাত এল! চারপাশ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় মুড়ে রেখেও তারা স্বস্তিতে নেই। এমন মর্মান্তিক ঘটনাও অহরহ ঘটে যে, রান্নাঘরে বা ফ্ল্যাটে আগুন লাগলে তালাবদ্ধ থাকার কারণে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অনেকেই প্রাণ হারান। যে নিরাপত্তার খোঁজে তারা শহরে এসেছিল, সেই তথাকথিত সুখের বন্দিশালাই তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়!

তাহলে সুখ আসলে কোথায়? প্রকৃতি বা স্রষ্টা আমাদের যতটুকু দিয়েছেন, তার মাঝে সন্তুষ্টি খুঁজে পেলেই সুখ আমাদের হাতের মুঠোয়। তা না হলে ‘সুখ’ নামক পাখির সন্ধান এ জীবনে আর মিলবে না। পরিশেষে সব ধর্মেরই একটি চিরন্তন বাণী আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—লোভ, হিংসা ও অহংকারই মানুষের ধ্বংসের মূল কারণ।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।