চকরিয়া কি মগের মুল্লুক?


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এখন আর রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। সেখানে গেলে আপনার মনে হতে পারে, এলাকাটি বোধহয় কোনো এক মাফিয়া চক্রের নিজস্ব স্বাধীন সাম্রাজ্য, যেখানে পুলিশ বা প্রশাসন বলতে নিছক কিছু সাইনবোর্ড ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি গ্রামে পাহাড়ি ছড়া ও ফসলি জমি উজাড় করে যে ভয়াবহ বালু-সন্ত্রাস চলছে, তা দেখলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতি ধিক্কার জানানো ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

সেখানে দিনের আলোতে এবং রাতের আঁধারে ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও শ্যালো মেশিনের গর্জনে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো গ্রাম। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফসলি জমি খুঁড়ে ৫০ ফুট গভীর গর্ত আর ছড়ার বুক চিরে ২০০ ফুট চওড়া খাল বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই মহাযজ্ঞের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রভাবশালী বালু লুটেরা নাজিম উদ্দিন এবং তার ভাই শাহাব উদ্দিন। তাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাহারায় এই ধ্বংসলীলা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম হারাম, বাতাসে উড়ন্ত বালুর ধুলোয় শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টে ধুঁকছেন। চোখের সামনে মসজিদ-মাদরাসা, সড়ক ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার প্রহর গুনছে, অথচ প্রশাসন যেন চোখে ঠুলি পরে বসে আছে!

পরিবেশের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের চিত্রটি আরও বেশি হৃদয়বিদারক। ইছাছড়ি ছড়াখালের দুই তীর ঘেঁষে থাকা কৃষিজমি ও জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলো যখন চরম হুমকির মুখে, তখন নিরীহ কৃষকেরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। তাদের সারা জীবনের সম্বল ওই একটুকরো ফসলি জমি যেকোনো মুহূর্তে বালুদস্যুদের সৃষ্ট কৃত্রিম খাদের গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের এই বোবা কান্না শোনার কেউ নেই। নাজিম উদ্দিন ও শাহাব উদ্দিনের মতো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহসও স্থানীয়দের নেই, কারণ প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে সশস্ত্র বাহিনীর খড়গ। গ্রামের সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে আছেন এই গুন্ডাবাহিনীর হাতে। প্রতিদিন শত শত ডাম্প ট্রাক বালু নিয়ে যাওয়ার সময় যে ধুলোবালি ও বিকট শব্দ তৈরি হয়, তাতে হারবাং ইউনিয়নের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর বা স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা দিনের পর দিন এই নীরব হত্যাযজ্ঞ দেখেও না দেখার ভান করে চলেছেন।

এই বালুদস্যুরা কতটা বেপরোয়া এবং রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট হয় সংবাদকর্মীদের ওপর তাদের বর্বরোচিত হামলা থেকে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি অবৈধ বালু উত্তোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে কালের কণ্ঠের চকরিয়া প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ, আমার দেশ পত্রিকার ইকবাল ফারুক এবং একুশে পত্রিকার এম. জিয়াবুল হকের ওপর পৈশাচিক হামলা চালানো হয়। খোদ নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে সাংবাদিকদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার চেষ্টা করা হয়! চরম মারধরে ছোটন কান্তি নাথের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়, এম. জিয়াবুল হকের ডান হাতের হাড় ভেঙে দেওয়া হয় এবং ধারালো অস্ত্রের কোপে ইকবাল ফারুকের হাতের তালু কেটে যায়। এমন ভয়ংকর হত্যাচেষ্টার পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলা হলেও পুলিশের টিকিটির দেখা মেলেনি। একজন আসামিও আজ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি, যা চকরিয়া পুলিশের চরম ব্যর্থতা ও নির্লজ্জ নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ।

তাহলে চকরিয়ায় পুলিশ ও প্রশাসন করছেটা কী? চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার—তাদের প্রত্যেকের মুখেই কেবল গালভরা বুলি আর আশ্বাসের ফুলঝুরি। চকরিয়া থানার ওসি মো. মনির হোসেন আসামিদের ধরতে নাকি ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহায়তা করবেন, অথচ মামলার এত দিন পরও প্রধান আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলছেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, আর ইউএনও শাহীন দেলোয়ার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েও কেবল একটি প্রতিবেদন তৈরির অপেক্ষায় বসে আছেন।

কী অদ্ভুত এক প্রহসন! এই কর্মকর্তাদের নাকের ডগা দিয়ে প্রতিদিন অবৈধ উপ-ইজারার নামে যখন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি আর লুটপাট চলে, তখন প্রশাসনের এই কুম্ভকর্ণের ঘুম প্রমাণ করে যে তারা হয় চরম অযোগ্য, নয়তো এই লুটেরাদের পকেট ভারী করার প্রক্রিয়ায় তাদেরও অলিখিত অংশীদারত্ব রয়েছে। প্রশাসনের এই নির্বিকার মনোভাব সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল করছে যে, টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে রাষ্ট্রের আইন। তহশিলদার থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক পর্যন্ত সবাই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটছে না। ইজারাদার দায় এড়িয়ে সাব-লিজের কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছেন, আর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে ওঠা এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

ইছাছড়ি গ্রামের এই নৈরাজ্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নামমাত্র জরিমানা বা লোকদেখানো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরির নাটক এবার বন্ধ হওয়া উচিত। চকরিয়ায় যদি সত্যিই রাষ্ট্রের কোনো আইনকানুন থেকে থাকে, তবে অবিলম্বে নাজিম উদ্দিন, শাহাব উদ্দিনসহ এই সশস্ত্র চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। ছোটন কান্তি নাথ, ইকবাল ফারুক এবং এম. জিয়াবুল হকের ওপর হামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ইজারা বাতিল করে এই ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে হবে, যাতে স্থানীয় কৃষকেরা অন্তত শান্তিতে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারেন।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।