পদে পদে বাধা জঙ্গল সলিমপুরে


কোথাও রাস্তার ওপর আড়াআড়ি করে রাখা হয়েছে বড় ট্রাক, কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে কালভার্ট, আবার কোথাও তুলে ফেলা হয়েছে নালার স্ল্যাব। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের ধরতে গিয়ে সোমবার সকালে এমনই সব পরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, বিশাল এই অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় গত রাতেই এসব বাধা তৈরি করে রেখেছে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা।

সোমবার সকাল ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযানে যৌথ বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। অভিযান সফল করতে সকাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে নিশ্ছিদ্র তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বেলা ১১টার দিকে বায়েজিদ লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুর যাওয়ার প্রবেশমুখ ছিন্নমূলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। তিনি এসব প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করে জানান, ছিন্নমূলের পরেই আলীনগর এলাকায় ঢোকার মূল রাস্তায় ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। পরে কালভার্টের ভাঙা অংশ ইট ও বালি দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়িগুলো ভেতরে প্রবেশ করে।

অভিযান শুরুর আগে কীভাবে তথ্য ফাঁস হলো, সে বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, এটি অনেক বড় অভিযান এবং জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের সোর্স রয়েছে। সেখান থেকেই হয়তো তারা আগেভাগে তথ্য পেয়ে যায়। তিনি আরও জানান, অভিযান চলমান থাকায় এখনই অস্ত্র উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের সঠিক সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে নির্বিঘ্নে অভিযান পরিচালনার জন্য সেখানে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে এদিন সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গা নিয়ে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অবস্থান। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এই অবৈধ বসতি এখন সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। এলাকাটিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং রোকন উদ্দিনের নেতৃত্বে দুটি পক্ষের অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যে আলীনগর এলাকায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মোহাম্মদ ইয়াসিনের। পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে সেখানে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে সন্ত্রাসীরা। গত বছরের অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিকও হামলার শিকার হন।

এই সাঁড়াশি অভিযানের মূল নেপথ্যে রয়েছে গত জানুয়ারি মাসের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। ওই সময় জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাব সাত এর উপসহকারী পরিচালক নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। সে সময় মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে সন্ত্রাসীরা রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে আটক এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয় এবং চার র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করে, যাদের পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান করে ২৯ জনের নাম উল্লেখ এবং ২০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তখন সমন্বিত অভিযান স্থগিত থাকলেও এখন তা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্যমতে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে মোহাম্মদ ইয়াসিন নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে দাবি করতে শুরু করেন। যদিও র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই এবং ওই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।