
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার হামলা-পাল্টা হামলার জেরে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে দিন পার করছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার হাজারো প্রবাসী ও তাদের পরিবার। অর্ধকোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মীর গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সাইরেন, কঠোর নিরাপত্তা ও চলাচলে সতর্কতা জারি হওয়ায় মিরসরাইয়ের ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার প্রবাসী পরিবারগুলোতে প্রিয়জনদের নিরাপত্তা নিয়ে এই গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে মিরসরাইয়ের প্রতিটি গ্রামের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশে থাকা পরিবারগুলো এখন সার্বক্ষণিক আতঙ্কে সময় কাটাচ্ছেন। তারা প্রতিনিয়ত মুঠোফোনে প্রিয়জনদের খোঁজ নিচ্ছেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কাতারে অবস্থানরত প্রবাসী জাহাঙ্গীর হোসাইন জানান, সেখানে গিয়ে তিনি একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং দেশ থেকে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, এখনো লাভের মুখ দেখিনি, এর মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন চরম আতঙ্কে সময় পার করতে হচ্ছে আমাদের।
সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে আরমান হোসেন জানান, বিভিন্ন স্থানে ইরানের ড্রোন হামলার খবর পেয়ে তারা অত্যন্ত আতঙ্কে আছেন। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় দেশ থেকে তার বাবা-মা বারবার ফোন করে খবর নিচ্ছেন।
একই ধরনের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন কুয়েত প্রবাসী ও মিরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদ চৌধুরী। তিনি জানান, প্রবাসীরা মোটেও ভালো নেই, আতঙ্কে দিন কাটছে। গত ৫ মার্চ ইরানের মিসাইল হামলায় সন্দ্বীপের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে জাহিদ জানান, বিভিন্ন সময় পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। যুদ্ধের কারণে সেখানে কিছুদিন তারাবিহ নামাজও বন্ধ ছিল, যা ৭ মার্চ থেকে স্বাভাবিক হয়েছে।
কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী আবুল খায়ের সেলিম বলেন, আকাশে তাকালেই শুধু মিসাইলের হামলা দেখা যায়, যা টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে। তিনি জানান, বিকট শব্দের পাশাপাশি মিসাইলের ভাঙা অংশ পড়ে অনেকে আহত হচ্ছেন। শহরের ভেতরে না পড়লেও শহরের বাইরে এসব পড়ছে, তাই বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে আসছেন তারা।
এদিকে দেশে থাকা স্বজনদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। সাহেরখালী ইউনিয়নের গৃহবধূ রোকেয়া বেগম জানান, তার তিন ছেলে দুবাইতে থাকেন। চলমান পরিস্থিতিতে তিনি নিয়মিত তাদের খোঁজ নিচ্ছেন এবং সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করছেন।
মিঠানালা ইউনিয়নের পূর্ব মলিয়াইশ গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জানান, তার তিন ছেলে, ভাই ও অনেক আত্মীয়-স্বজন মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। প্রতিদিন ফোন করে তাদের নিরাপদ স্থানে থাকার কথা বলছেন তিনি। টেলিভিশনে খবর দেখলেই তার ভয় লাগে বলে জানান তিনি।
ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার জানে আলম তার সৌদি আরব প্রবাসী ছেলেকে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকেন বলে জানান। পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। করেরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রহিম জানান, কুয়েতে বিমান ঘাঁটির পাশে থাকা তার দুই ছেলে খুবই আতঙ্কে আছেন। খামারের পাশে একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় তাদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। সৌদি আরবে কর্মরত স্বামী, ছেলে ও ভাইকে নিয়ে গৃহবধূ আয়েশা আক্তারও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন এবং তারা যেন নিরাপদে থাকেন সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান অস্থিরতা মিরসরাইয়ের প্রবাসীনির্ভর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকার ও দূতাবাসগুলোর তৎপরতায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে আশা তাদের।
মিরসরাই উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা শাকিলা জান্নাত নিশাত জানান, উপজেলায় ঠিক কতজন প্রবাসে আছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে সাম্প্রতিক এক জরিপের ভিত্তিতে তিনি বলেন, এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারেই দু-একজন প্রবাসী রয়েছেন। সেই হিসেবে মিরসরাইয়ে প্রায় ৫০ হাজার প্রবাসী অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
