
আজকের কলামটি শুরু করা যাক একটি প্রাচীন ও শিক্ষণীয় গল্প দিয়ে। একদিন এক যুবক মহান দার্শনিক সক্রেটিসকে প্রশ্ন করে বসল, “স্যার, সফলতার আসল রহস্য কী?” সক্রেটিস মৃদু হাসলেন এবং যুবকটিকে পরদিন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বললেন।
পরদিন সকালে যুবকটি কথামতো সেখানে উপস্থিত হলে, সক্রেটিস তাকে নিয়ে একটি নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে তারা যখন গলা পর্যন্ত গভীর পানিতে পৌঁছালেন, হঠাৎ সক্রেটিস ওই যুবকের মাথাটা ধরে পানির নিচে চেপে ধরলেন। যুবকটি হাঁসফাঁস করতে লাগল এবং ওপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু সক্রেটিস বেশ শক্ত হাতে তাকে আরও কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখলেন। অবশেষে যখন তিনি যুবকটির মাথা পানি থেকে তুললেন, তখন সে গভীর শ্বাস নিতে লাগল।
সক্রেটিস শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “তুমি যখন পানির নিচে ছিলে, তখন সবচেয়ে বেশি কী চাইছিলে?” যুবকটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উত্তর দিল, “আমি শুধু একটু অক্সিজেন চাইছিলাম।” সক্রেটিস তখন বললেন, “এটাই সফলতার আসল রহস্য! তুমি যখন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ঠিক ওই অক্সিজেনের মতোই ব্যাকুল হয়ে উঠবে এবং গভীরভাবে তার পেছনে লেগে থাকবে, তখন সফলতা তোমার কাছে ধরা দেবেই।”
আমরা অনেকেই আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার নাম শুনেছি। তাঁর সফলতার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। তাঁকে প্রায় ৩০ বার বিভিন্ন চাকরির সাক্ষাৎকার থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। একবার কেএফসিতে চাকরির জন্য ২৪ জন আবেদন করেছিলেন, যার মধ্যে ২৩ জনই নিয়োগ পেয়েছিলেন; বাদ পড়া একমাত্র ব্যক্তিটি ছিলেন জ্যাক মা! শুধু তাই নয়, ছাত্রজীবনেও তিনি বারবার অকৃতকার্য হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের মনের জোর এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে তিনি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তাঁর ভাষায়, “অসম্ভব বলতে কিছু নেই।”
ইতিহাস ঘাঁটলে এমন আরও অনেক মানুষের দেখা মেলে, যাঁরা চরম সংগ্রাম ও বাধা পেরিয়ে সফল হয়েছেন। ইলন মাস্ক, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা কিংবদন্তি ক্রিকেটার সনাথ জয়সুরিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
অ্যাপল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের জীবনের গল্পও আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জন্মদাত্রী মা তাঁকে একটি সাধারণ পরিবারের কাছে দত্তক দিয়ে দিয়েছিলেন। প্রবল আর্থিক সংকটের কারণে তিনি প্রথাগত পড়াশোনা বেশিদূর চালিয়ে নিতে পারেননি। তাঁর নিজের থাকার কোনো জায়গা ছিল না, বন্ধুদের ঘরের মেঝেতে ঘুমাতেন। খাবার কেনার জন্য রাস্তায় পড়ে থাকা কোমল পানীয়ের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করতেন। প্রতি রোববার ভালো এক বেলা খাবার খাওয়ার আশায় ১১ কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি শহরের এক মন্দিরে যেতেন।
কিন্তু এত অভাবের মাঝেও নিজের কাজের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আবেগ ও গভীর মনোযোগ। সেই স্টিভ জবসের হাত ধরেই অ্যাপল আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও দর্শন আজীবন রয়ে যাবে।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগৃহীত এই সফল মানুষদের জীবনবৃত্তান্ত আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। আপনি জীবনে যে কাজটিই করতে চান না কেন, তার প্রতি আপনার একটি সৎ জেদ ও একাগ্রতা থাকতে হবে। পাওলো কোয়েলহোর সেই বিখ্যাত কথার মতোই বলতে হয়—আপনি যদি মন থেকে সত্যিই কিছু চান এবং তার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন, তবে শুধু এই পৃথিবী নয়, সমগ্র মহাবিশ্ব আপনাকে সেই লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করবে।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।
