
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে চলমান ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী অনেক দিক থেকেই জয়ী হয়েছে, তবে চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য তা যথেষ্ট নয়। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান পার্টির এক সম্মেলনে এবং সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। তবে এই সপ্তাহেই তার সমাপ্তি ঘটবে না। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সদ্য মনোনীত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে গুরুত্ব না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেহরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ মস্কোকে ইরানকে সহায়তা না করার বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সেনাবাহিনীর সক্ষমতা এবং এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলি অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সামরিক শক্তির এক অভাবনীয় প্রদর্শনের মাধ্যমে শত্রুকে চূর্ণ করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, প্রথম হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কারণ ইরান এক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ব্যবস্থার ৮০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ড্রোন তৈরির কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনা মিলিয়ে ৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাদের যা কিছু ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে স্থলাভিষিক্ত করার যে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কটাক্ষ করে বলেন, অধিকাংশ মানুষ তার নামই শোনেনি। নিজের প্রথম মেয়াদে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, সোলাইমানি বেঁচে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। কাসেম সোলাইমানি অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং সক্ষম ছিলেন, কিন্তু শুরুতেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে ইরান কোনো বাধা দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি অনলাইন বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান তেলের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে এখনকার চেয়ে বিশ গুণ বেশি মাত্রায় আঘাত করা হবে। মৃত্যু, আগুন এবং ক্রোধ তাদের ওপর রাজত্ব করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এদিকে, ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ হওয়ার ইঙ্গিতের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ৯২ দশমিক ৫০ ডলারে এবং মার্কিন তেলের দাম ৮৮ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে এসেছে। তবে সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় এই দাম এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি বলে বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
গত ১০ দিন ধরে চলা এই সংঘাতের রেশ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানজুড়ে অন্তত এক হাজার ৭০৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানি রেড ক্রিসেন্টের দাবি, এই সংখ্যা এক হাজার ২৩০ জন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্তত আটজন সদস্যও এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘাতের মধ্যে তেহরান, তাবরিজ, মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে সরকার সমর্থকদের সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইসফাহানে একটি সমাবেশের কাছে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
রাশিয়া এই সংঘাতে ইরানকে সহায়তা করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং মস্কোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন সহায়তামূলক ভূমিকা রাখার কথা বললে তিনি তাকে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ তেহরানকে কোনো ধরনের সহায়তা না করার জন্য মস্কোকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন।
