জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?

চট্টগ্রাম মহানগরীর অতি সন্নিকটে অবস্থিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে এই বিশাল এলাকাটি যেন এক অচেনা, অজানা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীন একটি ‘স্বশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছিল। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে খোদ বন্দরনগরীর বুকে এমন একটি সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত এলাকার নিষ্কণ্টক অস্তিত্ব কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং তা রাষ্ট্রযন্ত্রের সামগ্রিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণকেই প্রবলভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

অবশেষে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর সাম্প্রতিক বৃহৎ অভিযান এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবরটি সমগ্র দেশবাসীর জন্য, বিশেষ করে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য এক গভীর স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে।

গত জানুয়ারি মাসে সেখানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সন্ত্রাসীদের অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) একজন অকুতোভয় সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই বিষাদময় ঘটনার পর এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে সেখানে একটি কঠোর, আপসহীন ও সমন্বিত অভিযান অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।

আমরা জানতে পারি যে, সোমবার ভোর পাঁচটা থেকে শুরু করে বেলা দুইটা পর্যন্ত একটানা দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার একটি ঐতিহাসিক অভিযান পরিচালিত হয়। এই বিশাল অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং বাংলাদেশ পুলিশ—এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সংশ্লিষ্ট সবার নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে হয়, কারণ তাদের প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের এক বিশাল সমন্বিত বাহিনী এই কার্যক্রমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেন।

তবে এই বিশাল আয়োজনের পরেও কিছু প্রশ্ন ও যৌক্তিক আক্ষেপ থেকেই যায়। এত বড় মাত্রার অভিযানেও চিহ্নিত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি এবং দেশীয় কিছু সাধারণ অস্ত্র ছাড়া কোনো ধরনের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র বা ভারী অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন যে, অস্ত্র বা সন্ত্রাসী ধরা না পড়লেও সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রাথমিক অর্জন।

তবে আমরা মনে করি, জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেবল এই অভিযান পরিচালনা এবং সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়। যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এতদিন এই অঞ্চলটিকে নিজেদের অভয়ারণ্য বানিয়ে রেখেছিল, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং গ্রেপ্তার করাটা এর চেয়েও বেশি জরুরি। তা না হলে এই নিয়ন্ত্রণ যেকোনো মুহূর্তে আবারও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস এক দীর্ঘ বঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও বেআইনি দখলের ইতিহাস। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এক বিশাল এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা এই জঙ্গল সলিমপুর, যা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে কার্যত সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। সেখানকার সবুজ পাহাড় কেটে এবং গহীন বন উজাড় করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ বসতি ও অপরাধের সাম্রাজ্য স্থাপন করেছে। এখানে একটি অত্যন্ত অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করা প্রয়োজন। যে রাজনৈতিক দল যখনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেছে, সেই দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার কারণেই এই সন্ত্রাসীরা সেখানে নিজেদের এক অটুট ও দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছিল।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া রাষ্ট্রের নাকের ডগায় এমন একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ জগৎ গড়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সময়ের পরিক্রমায় এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, সেখানে অন্য কোনো এলাকার সাধারণ নাগরিককে প্রবেশ করতে হলে রীতিমতো এই সন্ত্রাসীদের পূর্বানুমতি লাগত। এটি যেন রাষ্ট্রের ভেতরেই আরেকটি ছোট রাষ্ট্র! এমনকি রাষ্ট্রের বৈধ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে সেখানে দায়িত্ব পালনে বা অভিযানে গিয়ে এই সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়েছে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর এক চরম আঘাত।

জঙ্গল সলিমপুরের অবশিষ্ট বন ও পাহাড় রক্ষা করাটা এখন বর্তমান সরকারের একটি অত্যন্ত বড় এবং পবিত্র দায়িত্ব বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি। সোমবারের এই অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে সতর্ক করেছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে এবং নিষ্ঠুরভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে, তা যদি এখনই কঠোর হস্তে বন্ধ করা না হয়, তবে অচিরেই এই মনোরম প্রাকৃতিক এলাকাটি চিরতরে পাহাড়শূন্য এক বিরানভূমিতে পরিণত হবে। সলিমপুর যে এতকাল সন্ত্রাসীদের এক নিরাপদ আশ্রয় বা স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল, তার পেছনের সবচেয়ে বড় কারণটি হলো পাহাড় ও বন উজাড় করে গড়ে তোলা এক বিশাল ও বেআইনি প্লট-বাণিজ্য।

তথ্যমতে, সেখানকার মোট দখলকৃত জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের অশুভ হাতছানিই মূলত স্থানীয় ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সেখানে শেকড় গাড়তে উৎসাহিত করেছে। পাহাড়ের বুক চিরে, বনের গাছ কেটে সাবাড় করে তারা সেখানে প্লট তৈরি করেছে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এই অসাধু ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শুধু জঙ্গল সলিমপুরের অমূল্য পাহাড় ও বনাঞ্চলই ধ্বংস করেনি, তারা চরম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কয়েক হাজার সাধারণ ও নিরীহ পরিবারের কাছে এই অবৈধ জমিও বিক্রি করেছে। গত কয়েক দশকে সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিপুলসংখ্যক খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষের এক বিশাল লোকালয় গড়ে উঠেছে।

এই পরিবারগুলো জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে এক টুকরো মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের আশায় সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু সন্ত্রাসীদের কাছে এই পরিবারগুলো যে শুধু আর্থিকভাবে প্রতারিত হয়েছে তা নয়, বরং তাদের প্রতিনিয়ত জিম্মি করে রাখাও হয়েছিল। অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে সন্ত্রাসীরা নিয়মিত চাঁদা আদায় করত এবং তাদের নির্দেশ মানতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হতো। এই সাধারণ মানুষের মানবিক দিকটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জঙ্গল সলিমপুরকে কীভাবে সন্ত্রাসীদের কবল থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত রাখা যায়। সন্ত্রাসীরা যাতে কোনোভাবেই আর সেখানে ফিরে আসতে না পারে এবং তাদের হারানো রাজত্ব পুনর্দখল করতে না পারে, রাষ্ট্রকে যেকোনো মূল্যে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চলটিকে একটি স্বাভাবিক, শান্তিপূর্ণ এবং আইনি শাসনভুক্ত এলাকায় পরিণত করতে হলে সরকার সেখানে যে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার যথাযথ বাস্তবায়নের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করাটা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে যেন নতুন করে সলিমপুরের অবশিষ্ট পাহাড় ও বনভূমির ওপর কোনো খড়্গ নেমে না আসে। উন্নয়ন যেন কখনোই প্রকৃতির বিনাশের সমার্থক না হয়। কেননা, ইতিমধ্যে সামরিক-বেসামরিক, সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রায় ৪৮টি বড় বড় প্রতিষ্ঠান জঙ্গল সলিমপুরে নিজেদের অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেখানে যথেচ্ছভাবে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সন্ত্রাসীরা যা ধ্বংস করতে পারেনি, তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ তার বাকিটুকু চিরতরে ধ্বংস করে ফেলবে।

পরিশেষে, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জঙ্গল সলিমপুরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাষ্ট্রকে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জঙ্গল সলিমপুরের অবশিষ্ট অমূল্য পরিবেশ, পাহাড় ও প্রকৃতিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ সেখানে প্রতারণার শিকার হয়ে বসবাস করছেন, তাদের মানবিক স্বার্থ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করে একটি পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

জঙ্গল সলিমপুর যেন আর কখনো কোনো অপরাধের অভয়ারণ্য না হয়, বরং তা যেন রাষ্ট্রের আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে, সেটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর একান্ত প্রত্যাশা।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।