জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে বিতর্ক


জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

শফিকুর রহমানের এই উদ্বেগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিতে পারেন না।

রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলেই তা করেননি বলে সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তাব দেন।

আজ রোববার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে শফিকুর রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে এই অনির্ধারিত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।

বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয় এবং শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মাইক দিলে শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি।

এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে, যা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা হয়েছে বলে শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন।

সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি বলেই তাঁর প্রবল উদ্বেগ।

জুলাই সনদ আদেশের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান জানান, আদেশে বলা রয়েছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, কিন্তু সেটি এখনো গঠন হয়নি।

শফিকুর রহমান বলেন, যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও আহ্বান করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন বলে শফিকুর রহমান এ সময় উল্লেখ করেন।

এবারের সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ‘ক্যাপাসিটিতে’ নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান জানান, জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

এই আদেশ অনুসারে তাঁরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান বলে শফিকুর রহমান দাবি করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি এ বিষয়ে সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের সুস্পষ্ট জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

শুরুতে সালাহউদ্দিন আহমদ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে ফ্লোর দেওয়া হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানতে চান, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব আনতে হলে বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে হলে শফিকুর রহমান নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে কোনো নোটিশ দিয়েছেন কি না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে—এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না এবং সেটা আইনত জায়েজ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশটিকে ‘আরোপিত’ আদেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আইন; এটি মাঝামাঝি একটি জিনিস, যাকে তিনি ‘নিউটার জেন্ডার’ বলে মন্তব্য করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ বাদে সবগুলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন এবং এই সংসদের আহ্বানও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করেছেন।

কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না বলে সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, তবে সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন।

এখানে বিচার বিভাগ মতামত দিলেও তা সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাধ্যতামূলক নয় বলে সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন।

তবে সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা বিচার বিভাগে গিয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা সংবিধান লঙ্ঘন হবে, তাই উভয় দিকে লক্ষ রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এগোতে হবে বলে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার বিষয়টি মানলেও নির্বাচন কমিশনের দুটি কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট রয়েছে—একটি জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং অপরটি রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, গণভোটের জন্য আরেকটি আইন হয়েছে এবং সেখানে একটি জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সেই আদেশের একটি প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়, যেখানে মানুষের বিকল্প বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে বলে সালাহউদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে, কারণ ১৩৩টি অধ্যাদেশ এখানে প্রথম দিনেই উত্থাপিত হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয় এবং সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আগামী বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে দিতে হবে, কারণ রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে নয় বরং সংবিধান ও আইন দিয়ে চলে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার জন্য শফিকুর রহমানকে সরাসরি প্রস্তাব দেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তাঁরা সম্মান করেন।

কিন্তু এর বাইরে আরোপিত বা অবৈধ কোনো আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সালাহউদ্দিন আহমদ সেটিকে একটি বিশাল আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করে তা নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া যায় না।

এটির জন্য স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ লিখিত নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন এবং নোটিশ পাওয়ার পর যথাযথ সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জানান।