পণ্যের দামের ব্যবধান অনুসন্ধানে গঠন করা হবে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’


পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যের দামের অযৌক্তিক ব্যবধানের প্রকৃত কারণ খুঁজতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ বা তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ ঘোষণা দেন।

‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে দামের অগ্রহণযোগ্য ব্যবধান দেখা যায়।

এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, প্রশাসনের সদস্য এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য পেশাজীবীদের নিয়ে এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হবে বলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এই কমিটি বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, ডলারের মূল্য বা পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

তবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণজনিত কোনো কারণে যেন পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি না পায়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নিশ্চিত করেন।

বিদেশি ফল আমদানির বিষয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, আপেল, আঙুর ও কমলার মতো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা ফলের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করবে। তবে অত্যধিক দামি বিলাসী ফলের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির মন্তব্য করেন।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীরাই ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকারের কাজ হলো ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে বাজার যেন বাধাহীনভাবে পরিচালিত হতে পারে তা দেখা।

একই সঙ্গে বাজার তদারকির সময় ব্যবসায়ীরা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার কড়া নির্দেশ দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ব্যবসায়ীরা যদি মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেন, তবে তা সমাজে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

চলতি রমজান মাসে ভোজ্যতেলের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে জানিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এটিকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এজন্য তিনি পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।

তবে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সীমিত বিক্রির অজুহাতে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রবণতায় খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সরাসরি মতামত শোনার জন্যই তিনি খাতুনগঞ্জে এসেছেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আব্দুস সালাম সওদাগরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।

ব্যবসায়ীদের নানা দাবি ও অভিযোগ

মতবিনিময় সভায় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে মহাসড়কে ওজন স্কেল, নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও আমদানির সঠিক তথ্য, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি, আয়কর সমস্যা এবং চাঁদা ও ঘুষসহ নানা বিষয়ে সরকারের সহায়তা চেয়েছেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আব্দুস সালাম সওদাগর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে খাদ্যসরবরাহ পরিস্থিতি মারাত্মক সংকটে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে।

মো. আব্দুস সালাম সওদাগর আরও বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে সব ভোগ্যপণ্যের ডিউটি হ্রাস ও এলসি সুবিধা সহজীকরণ করতে হবে এবং ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য চার্জ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক মুনাফা অর্জন করতে পারছেন না।

মো. আব্দুস সালাম সওদাগর দাবি করেন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে হবে এবং পাইকারির চেয়ে খুচরা বাজারে সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে।

পণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিলে খাতুনগঞ্জকে দোষারোপ করা হয় উল্লেখ করে মো. আব্দুস সালাম সওদাগর জানান, মহাসড়কে ওজন স্কেল, সীমান্তে চোরাচালান ও বন্দরের মাশুল আকস্মিক পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

আয়কর প্রদানে জটিলতা ও অডিট নিয়ে তীব্র হেনস্তার অভিযোগ তুলে মো. আব্দুস সালাম সওদাগর বলেন, অনেক লোকসান হলেও বছর বছর আয়কর দিয়ে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সহ-সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ; যেমন খাতুনগঞ্জে ৯০ টাকার আদা বাইরে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

রেজাউল করিম আজাদ আরও জানান, ফল আমদানিতে ১ কেজিতে ১৪০ টাকা ডিউটি মার্জিন পড়ে যায় এবং এলসিতে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিতে হয়। ব্যাংকের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আয়কর প্রচণ্ড নিপীড়ন করে এবং টার্নওভার ধরে নিঃস্ব করে ফেলছে।

রেজাউল করিম আজাদ জানান, ভোক্তা অধিকার পুলিশ নিয়ে এসে চাপ প্রয়োগ করলে অনেক ব্যবসায়ী পালিয়ে যেতে চান এবং খাতুনগঞ্জে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই। তিনি ইমপোর্ট পারমিশন (আইপি) তদারকি করারও পরামর্শ দেন।

সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমদ রশীদ আমু বলেন, আয়করের যন্ত্রণায় অডিটে ফেলে কর নেওয়া হয় ১ লাখ টাকা আর ঘুষ নেওয়া হয় ৩ লাখ টাকা।

আহমদ রশীদ আমু নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, আগামী রমজানে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দাম বাড়াতে দেওয়া হবে না এবং তারা পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবেন।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুশ বশর চৌধুরী বলেন, দেশে উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্য দরকার।

আবুশ বশর চৌধুরী জানান, ২০-২৫ বছর আগে খাতুনগঞ্জে দেশের ৭০-৭৫ শতাংশ আমদানি হলেও এখন তা ২৫-৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

যুদ্ধের কারণে ফ্রেইট ভাড়া বৃদ্ধি এবং ডেমারেজ চার্জের কারণে কস্টিং বাড়ে উল্লেখ করে আবুশ বশর চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে ওজন স্কেলের কারণে প্রতি কেজিতে ১ টাকা খরচ বাড়ছে এবং আয়কর অফিস অযৌক্তিকভাবে ট্যাক্স বাড়াতে বলছে।

আমিনুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় মীর মো. সাজ্জাদ উল্ল্যাহ, এসএম সেলিম, ফরিদুল আলম মহিউদ্দিন, রাশেদ আলী, আকবর আলী, রাইসুল ইসলাম, সাঈয়েদ মুহাম্মদ আলী, রাশেদ পারভেজ, সালাউদ্দীন চৌধুরী এবং মো. শাহেদ প্রমুখ ব্যবসায়ী নেতা উপস্থিত ছিলেন।