
দিনের বেলায় প্রখর সূর্য আর মেঘমুক্ত রাতের আকাশে খালি চোখে আমরা অসংখ্য আলোকপিণ্ড দেখতে পাই। বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় জ্যোতিষ্ক। যাদের নিজস্ব আলো আছে, তাদের আমরা নক্ষত্র বলি; আর যাদের নিজস্ব আলো নেই, তাদের বলি গ্রহ বা উপগ্রহ। এই অনন্ত মহাবিশ্বে কত কোটি গ্রহ, নক্ষত্র বা ব্ল্যাকহোল আছে, তা একমাত্র স্রষ্টাই ভালো জানেন। তিনি নিজের মতো করে এই নিখুঁত মহাবিশ্বের নকশা করেছেন, আর বিজ্ঞানীরা স্রষ্টার সেই সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন।
রাতের আকাশে রুপালি থালা বা তন্দুরি রুটির মতো যে চাঁদটি আমরা দেখি, তা আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার। সেই বেগে ছুটে এসে চাঁদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগে ১.৩ সেকেন্ড। বিশাল এই সৌরজগতে পৃথিবী একটি গ্রহ মাত্র, যার শক্তির একমাত্র উৎস সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর মতো আরও সাতটি গ্রহ অবিরাম ঘুরছে। সূর্য থেকে আমাদের পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার, আর সেখান থেকে আলো আসতে সময় লাগে আট মিনিট—একবার ভাবুন তো! এই সৌরজগত আবার মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ। আলোর গতিতে ছুটলেও এই আকাশগঙ্গার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে সময় লাগবে ১ লাখ ৩০ হাজার বছর। স্যার আর্থার এডিংটনের মতে, প্রতিটি গ্যালাক্সিতে প্রায় দশ সহস্র কোটি নক্ষত্র রয়েছে। মহাবিশ্বের এই বিশালত্ব আসলে আমাদের কল্পনারও অতীত।
এবার আসা যাক আমাদের নীল গ্রহ পৃথিবীর কথায়। মেরু অঞ্চলের সাদা বরফ, পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ জুড়ে থাকা সাগর এবং বায়ুমণ্ডলের কারণে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে নীল দেখায়। আজ পর্যন্ত এত গবেষণার পরও বিজ্ঞানীরা কেবল এই পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন, অন্য কোথাও নয়। আমরা জানি, পৃথিবীর পৃষ্ঠের ৭১ শতাংশই পানি। কিন্তু মহাসাগরের গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের নিচেও যে কঠিন মাটি রয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগর, খাল-বিল, ভূগর্ভস্থ পানি এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে পাওয়া পানি যদি এক জায়গায় করা হয়, তবে তা পৃথিবীর মোট আয়তনের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশের মতো হবে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই ১ শতাংশ পানির আবার ৯৭ শতাংশই লবণাক্ত। বাকি ৩ শতাংশের মধ্যে ৩৯ শতাংশ আটকে আছে হিমবাহ ও বায়ুমণ্ডলে। আর আমাদের পানের উপযোগী বিশুদ্ধ পানি রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ!
এই পৃথিবীতে জল, স্থল, পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, মরু ও মেরু অঞ্চলের পাশাপাশি বাস করে অসংখ্য প্রজাতির পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আমার আগের কলামেও বলেছিলাম—এই পৃথিবী কেবল আপনার বা আমার একার নয়। অথচ মহাবিশ্বের এই ছোট্ট নীল গ্রহটিতে আজ কেবলই হিংসা, অহংকার আর ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। চারদিকে চলছে মারামারি আর যুদ্ধ। স্রষ্টা কাউকে মাটির নিচে দিয়েছেন তেলের খনি, কাউকে অন্যান্য মূল্যবান খনিজ পদার্থ, আবার কাউকে দিয়েছেন উর্বর কৃষিজমি। যার যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে একে অপরের সঙ্গে বিনিময়ের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার কথা ছিল। কিন্তু আজ খনিজ সম্পদ আর আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
সম্পদের লোভে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি ডলারের স্থাপনা, এক নিমিষে ধূলিসাৎ হচ্ছে দেশের পর দেশ। যুদ্ধে ব্যবহৃত মারণাস্ত্র, বোমারু বিমান আর হাইপারসনিক মিসাইলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে বাতাস, বিষাক্ত হচ্ছে পানি। চারদিকে কেবলই বারুদের গন্ধ আর লাশের সারি। ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি, বিঘ্নিত হচ্ছে খাদ্যশৃঙ্খল এবং অকালে ঝরে যাচ্ছে লাখো মানুষের স্বপ্ন। জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢাকা পড়ে আমাদের এই সুন্দর নীল গ্রহটি আজ সত্যিই বিবর্ণ ও চরম হুমকির মুখে। মনের গভীরে তাই বারবার একটি প্রশ্নই জাগে—পৃথিবী কি আসলেই কোনো দিন শান্ত হবে?
কোনো এক বিজ্ঞানীর ভাষায়, পৃথিবী থেকে যদি মৌমাছি, পিঁপড়ে, কীটপতঙ্গ বা পাখি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে পরাগায়নের অভাবে পুরো বিশ্বে ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেবে। খাদ্যাভাবে মারা যাবে লাখ লাখ মানুষ। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল পরাশক্তি চীনে; কেবল পাখি মারার হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।
